উত্তরের জেলা বগুড়ায় শীতের আমেজ জেঁকে বসার আগেই মাঠজুড়ে শুরু হয়েছে আগাম জাতের আলু উত্তোলনের উৎসব। তবে এই উৎসবের আবহে কৃষকের মুখে হাসির বদলে ফুটে উঠেছে দুশ্চিন্তার রেখা। মৌসুমি আলু বাজারে আসার আগেই আগাম আলুর সরবরাহ বাড়লেও গত বছরের তুলনায় দাম অর্ধেকে নেমে আসায় বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি আর বাজারদরে এই নজিরবিহীন ধসের কারণে বিনিয়োগ হারানো শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
বুধবার সকালে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও গাবতলীসহ বিভিন্ন উপজেলার মাঠগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই কোদাল হাতে আলু তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষি শ্রমিক ও চাষিরা। মাঠেই চলছে বাছাই এবং বস্তাজাত করার কাজ। তোলা শেষ হতেই এই আলু ট্রাকে করে পৌঁছে যাচ্ছে স্থানীয় পাইকারি আড়ত মহাস্থান হাটে কিংবা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে মাঠ পর্যায়ে এই ব্যস্ততা থাকলেও দামের ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারেই হতাশাজনক। বাজারে নতুন আলুর জোগান থাকলেও চাহিদার তুলনায় দাম মিলছে যৎসামান্য।
কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, গত বছর এই সময়ে নতুন আগাম আলু প্রতি মণ (৪০ কেজি) ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। সে হিসেবে প্রতি কেজির দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকার উপরে। অথচ চলতি বছর বাজারে নতুন আলুর প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়।
কেজি প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক এবং সেচ খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরিও গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, বর্তমান বাজারদরে তার অর্ধেকও ফিরে আসছে না।
শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষক মো. অহেদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত বছর আলুর দামে আশার আলো দেখেছিলাম। এবার লাভের আশায় সবকিছুর চড়া দাম সত্ত্বেও আলু বুনেছি। কিন্তু এখন দেখছি দাম একদম মাটির সাথে মিশে গেছে। এই দামে আলু বিক্রি করলে পরিবারের খরচ চালানো তো দূরের কথা, ধারের টাকা শোধ করাই দায় হয়ে পড়বে।” কৃষকদের দাবি, ডিজেল থেকে শুরু করে সব ধরনের কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি তাদের কোমর ভেঙে দিয়েছে।
অন্যদিকে, পাইকারি ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নতুন আলুর দাম কম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো হিমাগারগুলোতে এখনও বিপুল পরিমাণ পুরনো আলুর মজুত থাকা। গাবতলীর পাইকার মো. আলেক মিয়া জানান, গত বছরের আলুর সরবরাহ এখনও বাজারে পর্যাপ্ত। ভোক্তা পর্যায়ে তুলনামূলক কম দামে পুরনো আলু পাওয়া যাচ্ছে বলে নতুন আলুর বাড়তি দাম দিতে ক্রেতাদের অনীহা রয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নতুন আলুর বাজারমূল্যের ওপর।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে। হেক্টর প্রতি গড় ফলন হয়েছে প্রায় ১৭ টন, যা আশাব্যঞ্জক। তবে বাজার পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে কৃষি বিভাগ চাষিদের আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে সরিষা বা অন্যান্য লাভজনক রবি শস্য চাষের পরামর্শ দিয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর জেলায় ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, “আমরা শুরু থেকেই কৃষকদের বিকল্প ফসলের দিকে নজর দিতে বলেছিলাম। তবে যারা আগাম আলু চাষ করেছেন, তারা বর্তমানে বাজারদরের কারণে চাপে আছেন। যদি সরকারি পর্যায়ে দ্রুত আলু রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বাজারে পুরনো আলুর চাপ কমে আসে, তবে নতুন আলুর দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
বগুড়ার আলুচাষিরা এখন সরকারি হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের মতে, আলু সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার ব্যবস্থা থাকলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমত। বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ায় গতি আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগী কৃষকরা।

