দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত কুমিল্লা-৬ (সদর, সদর দক্ষিণ, সিটি করপোরেশন ও সেনানিবাস) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও প্রবীণ রাজনীতিক হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন।
বুধবার সকালে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসানের কার্যালয় থেকে তার অনুসারীরা এই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যে তার এই পদক্ষেপ কুমিল্লার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মনোনয়ন সংগ্রহের সময় হাজী ইয়াছিনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন একঝাঁক হেভিওয়েট নেতা। এদের মধ্যে সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এ বারী সেলিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম চৌধুরী এবং কুমিল্লা মহানগর ও আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ অঙ্গসংগঠনের বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। নেতাকর্মীদের এই সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরেও হাজী ইয়াছিনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও জনভিত্তি অত্যন্ত সুসংহত।
নির্বাচনী ময়দানে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন গণমাধ্যমকে জানান, তার নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে নানা রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রতিকূলতা সহ্য করে মাঠে টিকে আছেন। তারা সবসময় তাকে পাশে পেয়েছেন এবং তাদের দাবির মুখেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আজ সকালে নেতাকর্মীরা আমাকে মনোনয়ন সংগ্রহের ব্যাপারে অনুরোধ জানালে আমি তাদের অনুমতি দিই। তারা আমার শক্তির উৎস, তাদের আবেগ ও দাবির প্রতি সম্মান জানানো আমার দায়িত্ব।”
তবে দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটিই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তিনি বলেন, “আগামীকাল আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করছেন। তিনি দেশে ফেরার পর সব মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে বসবেন এবং চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেবেন।
আমি এখনও আশাবাদী যে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।” দলীয় মনোনয়ন না পেলে তিনি ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে আমি আমার নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে পরামর্শ করব। তাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য যে, কুমিল্লা-৬ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এবারের নির্বাচনে এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের অপর উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত তার মনোনয়নপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হাজী ইয়াছিনের অনুসারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। গত দুই সপ্তাহ ধরে তারা এই মনোনয়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুমিল্লা-৬ আসনে হাজী ইয়াছিন যদি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থেকে যান, তবে তা বিএনপির ভোট ব্যাংকে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে মনিরুল হক চৌধুরীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে হাজী ইয়াছিনের তৃণমূলের শক্ত অবস্থান—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে আসনটি রক্ষা করা বিএনপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন সবার নজর আগামীকাল ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

