বাংলাদেশে সড়ক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের এক অপরিহার্য দাবি। দক্ষিণ এশিয়ার এই জনবহুল দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক বিদ্যমান। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) প্রদত্ত তথ্যের সাথে বেসরকারি সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানের বিশাল ব্যবধান প্রায়ই জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সরকারি হিসাবের তুলনায় অন্তত ছয় গুণ বেশি। পরিসংখ্যানের এই জটিলতা ছাপিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের আইনি কাঠামো। একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রে সড়ক নিরাপত্তা কেবল দুর্ঘটনা প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুর্ঘটনার পরবর্তী সুরক্ষা প্রদানও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনে একটি ঐতিহাসিক মোড় ছিল ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। ওই বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় দুই স্কুল শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু সারা দেশে এক অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলনের জন্ম দেয়। জনমানুষের তীব্র ক্ষোভ ও দাবির মুখে সরকার তড়িঘড়ি করে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পাস করতে বাধ্য হয়।
যদিও এই আইনটি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নানামুখী চাপে দীর্ঘ চার বছর ঝুলে ছিল এবং বিধিমালা প্রণয়ন করতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে, তবুও এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের একটি আইনি ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই আইনের ৯ম অধ্যায় এবং বিধিমালার ৮ম অধ্যায়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা তহবিল পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে।
বর্তমান আইনের বিধান অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী এককালীন ৫ লক্ষ টাকা, অঙ্গহানি বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার ব্যক্তি ৩ লক্ষ টাকা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে এমন আহত ব্যক্তি চিকিৎসাব্যয় বাবদ ১ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার যোগ্য। এই অর্থ সংগ্রহের জন্য মোটরযান মালিকদের কাছ থেকে বাৎসরিক বা এককালীন চাঁদা, সরকারি অনুদান এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জরিমানা থেকে প্রাপ্ত অর্থ সমন্বয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে।
তবে এই সহায়তার পরিমাণ নিয়ে জনমনে এবং অধিকার কর্মীদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ রয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এই পরিমাণটি একেবারেই নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে তোপখানা রোডে বাসের চাকায় দুই পা হারানো এক সাংবাদিকের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছিল ৩০ লক্ষ টাকারও বেশি। সাধারণ কোনো মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব। ফলে বর্তমান ক্ষতিপূরণ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ও সহায়তা বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।
আইনি কাঠামোর আরেকটি দুর্বল দিক হলো আবেদনের সময়সীমা। বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার মাত্র এক মাসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে হয়। একটি পরিবার যখন স্বজন হারানোর শোকে মুহ্যমান থাকে অথবা গুরুতর আহত স্বজনের প্রাণ বাঁচাতে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘোরে, তখন মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন ও অমানবিক।
এই সময়সীমা বৃদ্ধি করা এবং আবেদন প্রক্রিয়া সহজতর করা জরুরি। এ ছাড়াও ট্রাস্টি বোর্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। বিআরটিএ সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রচার শুরু করলেও প্রান্তিক পর্যায়ের ভুক্তভোগীরা এখনো এই আইনি অধিকার সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততর করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলো সড়ক নিরাপত্তায় বিমা ব্যবস্থাকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। যুক্তরাজ্যে বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ইনজুরির ধরন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদানের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো ভিকটিমদের আইনি সহায়তা প্রদান করে এবং কর্মক্ষমতা হারানোর গুরুত্ব অনুযায়ী সহায়তার পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিশালী বিমা ও সহায়তা ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতও তাদের বিমা ও চিকিৎসা সহায়তা ব্যবস্থায় প্রগতিশীল পরিবর্তন এনেছে। ২০২৫ সাল থেকে ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতদের চিকিৎসার জন্য নগদহীন (ক্যাশলেস) চিকিৎসা সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডে সরকারি বিমা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষায় বিশেষায়িত সংস্থা কাজ করছে, যা আসিয়ান ফ্রেমওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত।
ভুটানের মতো ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রও ২০২৩ সালে ‘সিভিল লায়াবিলিটি অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে দুর্ঘটনায় আহতদের পুনর্বাসনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুরে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আদালত কর্তৃক নির্ধারিত হয়, যা ভুক্তভোগীর জীবনযাত্রার মান এবং ভবিষ্যতের উপার্জনের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে প্রদান করা হয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, কেবল একটি তহবিল গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং একটি শক্তিশালী বিমা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আইনি জটিলতা কমিয়ে আনা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে বিমা ব্যবস্থা এখনো জনপ্রিয়তা পায়নি এবং বিমা দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থা কাজ করে। এই অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে পারলে এবং তৃতীয় পক্ষীয় ঝুঁকি বিমা (Third-party Insurance) কার্যকরভাবে চালু করলে সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হতো।
সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি তাৎক্ষণিক বিপর্যয় নয়, এটি একটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের চক্রে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন প্রাণ হারান বা পঙ্গুত্ব বরণ করেন, তখন সেই পরিবারের শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে রাজধানীর ইস্কাটনে ট্রাক চাপায় প্রাণ হারানো দুই যুবকের সন্তানদের অসহায়ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল এককালীন কিছু অর্থ দিয়ে রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুদের শিক্ষা এবং চিকিৎসায় রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। দেশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে নিম্ন-মধ্যবিত্ত, সেখানে সড়ক নিরাপত্তাকে বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।
উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন একটি ভালো সূচনা হতে পারে, তবে এটি কোনোভাবেই একটি পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন নয়। সড়কের নকশা পরিবর্তন, দক্ষ চালক তৈরি, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
পাশাপাশি, দুর্ঘটনায় হতাহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি, আবেদনের সময়সীমা সংস্কার এবং একটি শক্তিশালী বিমা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ভবিষ্যতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উচিত সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা। একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল বৈষম্যহীন এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

