‘আমার বড় ভাই শামীম সবসময় বলতো—ভাই তুই কোনো চিন্তা করিস না, আমি তো তোর সাথে আছি। সেই ভাই আজ আমাকে চিরতরে ছেড়ে চলে গেল। এখন আমরা কাকে নিয়ে থাকবো? ভাই, তুই একটা বার ফিরে আয় না! তোর পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিতাম। ভাই, আমি তোকে কোনোদিন মুখ ফুটে বলতে পারিনি যে তোকে কত ভালোবাসি!’
সুদানে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে নিয়োজিত থাকাকালীন কর্তব্যরত অবস্থায় শাহাদাত বরণকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ল্যান্স কর্পোরাল শামীম রেজার নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন তাঁর মেজো ভাই সোহেল রানা। সৌদি আরব প্রবাসী সোহেল রানা বড় ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তিন দিন আগেই দেশে ফিরেছেন প্রিয় ভাইকে শেষবারের মতো দেখার জন্য। কিন্তু ভাইয়ের লাশবাহী খাটিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর করুণ আর্তনাদ সেখানে উপস্থিত শত শত মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছে।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার এই বীর সন্তানের মরদেহ যখন নিজ গ্রামে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে এক শোকাবহ স্তব্ধতা। এর আগে দুপুর পৌনে ২টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে করে শহীদ শামীম রেজার মরদেহ ঢাকা থেকে কালুখালীর মিনি স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখান থেকে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে মরদেহটি তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
শহীদ শামীম রেজার মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর সংবাদে সকাল থেকেই আত্মীয়-স্বজন, বাল্যবন্ধু এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা তাঁর বাড়িতে ভিড় জমাতে শুরু করেন। মরদেহবাহী গাড়িটি বাড়ির আঙিনায় পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শামীমের বৃদ্ধ বাবা-মা, শোকাতুর স্ত্রী এবং আদরের বোন বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। শামীম কেবল তাঁর পরিবারেরই নয়, বরং পুরো গ্রাম ও দেশের গর্ব হিসেবে আজ না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
বাড়িতে মানুষের ভিড় ও স্থানের সংকুলান না হওয়ায় মরদেহটি সরাসরি জানাজাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল সুশৃঙ্খলভাবে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে এই বীর সেনানীকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায়। জানাজার পূর্বে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে শহীদ শামীম রেজার কর্মময় জীবনী পাঠ করা হয়। এরপর তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই জানাজা সম্পন্ন হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। দাফন শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাঁর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং মরণোত্তর সালাম প্রদান করা হয়।
শামীম রেজার চলে যাওয়া রাজবাড়ীর মানুষের জন্য কেবল একজন প্রিয়জন হারানো নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও বিশ্বশান্তি রক্ষায় এক নির্ভীক যোদ্ধার চিরবিদায়। তাঁর ভাইয়ের সেই আর্তনাদ—‘ভাই আমি তোকে অনেক ভালোবাসি’—যেন কালুখালীর আকাশে-বাতাসে এক অবিস্মরণীয় শোকের প্রতিধ্বনি হয়ে রয়ে গেল।

