অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য হুমকিগুলোর মধ্যে অন্যতম। যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীর মতো জীবাণুগুলো নিজেদের এমনভাবে পরিবর্তিত করে যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস (অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিভাইরাস, অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক) ওষুধ তাদের বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে যায়, তখন সেই অবস্থাকে এএমআর বলা হয়। এর ফলস্বরূপ, পূর্বে সাধারণ ও নিরাময়যোগ্য সংক্রমণও কখনো কখনো মারাত্মক বা নিরাময়-অসাধ্য হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতেই প্রতিবছর ১৮-২৪ নভেম্বর ‘বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ সচেতনতা সপ্তাহ’ (WAAK) পালন করা হয়। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য হলো: ‘এখনই পদক্ষেপ নিন: আমাদের বর্তমানকে রক্ষা করুন, আমাদের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করুন’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ২০১৯ সালে সরাসরি ১.২৭ মিলিয়ন মৃত্যুর কারণ হয়েছিল এবং মোট ৪.৯৫ মিলিয়ন মৃত্যুর জন্য অবদান রেখেছিল। পূর্বাভাষ অনুযায়ী, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন বা তারও বেশি হতে পারে, যা এক নীরব মহামারির জন্ম দেবে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মূল কারণ হলো জীবাণুর প্রাকৃতিক বিবর্তন প্রক্রিয়া। জীবাণুর জেনেটিক উপাদানে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে তারা ওষুধের টার্গেট বা বাইন্ডিং সাইট পরিবর্তন করতে পারে। আবার, ব্যাকটেরিয়া এমন কিছু অ্যানজাইম তৈরি করতে পারে যা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধটিকে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এছাড়াও, ব্যাকটেরিয়া তার কোষের প্রবেশদ্বার পরিবর্তন করে বা পাম্প তৈরি করে যা ওষুধকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না বা দ্রুত বের করে দেয়। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, একটি রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া সহজেই তার রেজিস্ট্যান্স জিন অন্য ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে বিনিময় করতে পারে, যা প্রতিরোধের ক্ষমতাকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
তবে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করে দিচ্ছে মানুষের ভুল ও অযাচিত আচরণ। রেজিস্ট্যান্স তৈরির প্রধান মানবসৃষ্ট কারণগুলো হলো:
অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার: ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন সাধারণ সর্দি, ফ্লু) বা অন্যান্য সংক্রমণ, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক দরকার নেই, সেখানেও এর ব্যবহার।
অসম্পূর্ণ কোর্স: রোগী সুস্থ বোধ করার পর ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স বন্ধ করে দেওয়া। এর ফলে দুর্বল ব্যাকটেরিয়া মরে যায়, কিন্তু শক্তিশালী ও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে থাকে।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদে যথেচ্ছ ব্যবহার: দ্রুত বৃদ্ধির জন্য বা সংক্রমণ প্রতিরোধে কৃষি, মাছ ও পশুপাখি পালনে দীর্ঘদিন ধরেই অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে।
দুর্বল স্যানিটেশন: হাসপাতাল বা সামাজিক চলাচলে দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধির কারণে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু দ্রুত ছড়ায়।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সমস্যা রয়েছে। বিশেষত ভারত, চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং নাইজেরিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলো এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। ভারতে নিওনেটাল সেপসিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একাধিক ফার্স্ট-লাইন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার রেজিস্ট্যান্স দেখা যায়। অন্যদিকে, গ্রিস ও ইতালিতে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার কার্বাপেনেম রেজিস্ট্যান্স গুরুতর উদ্বেগের কারণ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি: বাংলাদেশে রেজিস্ট্যান্সের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে নির্দিষ্টভাবে ‘কতগুলো ওষুধের রেজিস্ট্যান্স হয়েছে’ এই সংখ্যাটি এলাকা ও হাসপাতাল ভেদে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। বিভিন্ন জাতীয় গবেষণায় দেখা গিয়েছে:
তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন: E. coli এবং Klebsiella Pneumoniae-এর মতো সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর কার্যকারিতা বহুল পরিমাণে কমে গেছে।
কার্বাপেনেম: ‘লাস্ট-রিসোর্ট’ অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে বিবেচিত হলেও, বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে কার্বাপেনেম-রেজিস্ট্যান্ট অ্যান্টারোব্যাকটেরিয়াসি-এর সংক্রমণ বাড়ছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ফ্লুরোকুইনোলোন: টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই ওষুধের রেজিস্ট্যান্সের হার অনেক জায়গায় ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আতঙ্কজনক করে তুলেছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেবল মানুষের সমস্যা নয়; এটি প্রাণী এবং পরিবেশের মধ্যেও আবর্তিত। এই সমস্যা মোকাবিলায় ‘ওয়ান হেলথ’ (One Health) ধারণাটি অপরিহার্য। ওয়ান হেলথ হলো মানুষের স্বাস্থ্য, অন্যান্য প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে এক ছাতার নিচে এনে কাজ করার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা।
সমাধানের জরুরি পদক্ষেপসমূহ: ১. সমন্বিত স্টুয়ার্ডশিপ: চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, কৃষি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ এবং মাইক্রোবায়োলজিস্টদের সমন্বিত ডেটা আদান-প্রদান ও কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্সের উৎস চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণ করা। ২. কৃষি ও পশুপালনে নিয়ন্ত্রণ: মাছ-পশুপালনে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা ও উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। ৩. পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ: ওষুধ তৈরির বর্জ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া যাতে জল ও মাটিতে না ছড়ায়, তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ৪. আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশে ‘ওষুধ আইন ২০২২’-এ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু এই আইন মানা হয় না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নিয়মিত ও কঠোর তদারকি ও শাস্তির মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। ৫. সচেতনতা বৃদ্ধি: অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিপদ সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার চালানো। ৬. হাসপাতালভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করা এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্তকে ল্যাবরেটরি ডেটা (অ্যান্টিবায়োগ্রাম) দ্বারা পরিচালিত করা।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে লড়াইটি দীর্ঘমেয়াদি। এই সমস্যা মোকাবিলায় গবেষণা, শক্তিশালী নীতিমালা এবং সর্বোপরি ব্যক্তিগত সচেতনতা অপরিহার্য।
