একুশ শতকের এই সন্ধিক্ষণে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন জ্ঞানের দুয়ার খুলে দিয়েছে, ঠিক তেমনি তৈরি করেছে এক অদৃশ্য ও ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধ কোনো ভূখণ্ড দখলের নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস ও মস্তিষ্ক দখলের। বর্তমান বিশ্বে একে অভিহিত করা হচ্ছে ‘ভুয়া সংবাদের যুদ্ধ’ হিসেবে। এটি কেবল ভুল তথ্যের সমাহার নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্ত্র, যা মুহূর্তেই জনমনে অস্থিরতা তৈরি করতে এবং মানুষের আচরণকে ভুল পথে পরিচালিত করতে সক্ষম। এই ডিজিটাল গোলকধাঁধায় সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা আজ এতটাই অস্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ এই তথ্যযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৩ সালের রামু ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্তাপ—সবক্ষেত্রেই গুজব বা অর্ধসত্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগতির তথ্য-প্রবাহ বর্তমানের মিডিয়া নীতিশাস্ত্র এবং গণতান্ত্রিক অনুশীলনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য যখন মিসইনফরমেশনকে কৌশলগত অস্ত্র (Information Warfare) হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা দেশের গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিজের মতাদর্শের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার প্রবণতা ফ্যাক্ট চেকিংয়ের মতো মহৎ উদ্যোগকেও অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থান এই সংকটকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে। এক সময় বিশ্বাস করা হতো ‘চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জনই সত্য’, কিন্তু এআই-প্রস্তুত ‘ডিপফেক’ ভিডিও এবং নিখুঁতভাবে সম্পাদিত ছবি সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখন কোনো কিছু দেখলেই মনে সন্দেহের দানা বাঁধে—এটি কি বাস্তব নাকি যন্ত্রের কারসাজি? ২০২৪ সালের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে এআই-এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আবেগপ্রবণ জনমত এই প্রযুক্তিগত বিবর্তনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ভুল তথ্য এখন কেবল বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যম নয়; এটি মানুষের জীবন বিপন্ন করার এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করার এক মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির নেপথ্যে মূলধারার গণমাধ্যমের সংকটকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ড. আবদুল কাবিল খান জামিলের মতে, মালিকানাগত স্বার্থ এবং তথ্যের দ্রুততা বজায় রাখার অসম প্রতিযোগিতায় অনেক সময় সাংবাদিকরা নির্ভুলতাকে বিসর্জন দিয়ে গতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যখন একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম কোনো যাচাইহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা ভিডিওকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব যেমন ক্ষুণ্ণ হয়, তেমনি জনমনে আস্থার সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্রের টিকে থাকা অসম্ভব, আর সেই স্বাধীনতার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিক সাংবাদিকতা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতীতে গুজবের কারণে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আমাদের বারবার সতর্ক করে। ২০১৯ সালে ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’—এমন একটি অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক গুজবের জেরে গণপিটুনিতে নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। করোনা মহামারির সময় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানাবিধ ভুল তথ্যের কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছিল। আগামী ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই হুমকি এখন আরও ঘনীভূত। ‘ইলেকশন ইন্টিগ্রিটি টাস্ক ফোর্স’ (ইআইটিএফ) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, বাংলাদেশ বিদেশি তথ্য-প্রভাব ও হস্তক্ষেপের (FIMI) লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। দেশের বিশাল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব থাকায় ফেক অ্যাকাউন্ট এবং অপপ্রচারের মাধ্যমে সহজেই তাদের বিভ্রান্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ডিজিটাল যুগের এই জটিল সমীকরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে এটি নাগরিক মতপ্রকাশের অবারিত সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে ঘৃণামূলক প্রোপাগান্ডা ও বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। পুরাণের নারদ ও সঞ্জয়ের উপমার মাধ্যমে বর্তমান গণমাধ্যম বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আজ তথ্যের শুদ্ধতা বজায় রাখা ‘সঞ্জয়’রা প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন, আর ভিউ ও অ্যালগরিদমের নেশায় মত্ত ‘নারদ’রা প্রভাব বিস্তার করছেন। এই অন্ধত্বের পরিণাম হতে পারে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও সামাজিক বিপর্যয়।
তবে অন্ধকারের বিপরীতে আলোর রেখা হিসেবে দাঁড়িয়েছে নতুন এক ‘সত্যান্বেষী’ প্রজন্ম। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সীর মতো এই আধুনিক ফ্যাক্টচেকাররা তথ্যের গোলকধাঁধা ভেদ করে সত্যকে উন্মোচন করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মিথ্যা ছবি, এডিট করা ভিডিও এবং কৌশলী প্রোপাগান্ডার জট ছাড়িয়ে নির্ভুল তথ্যের আলো পৌঁছে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে। যদিও মানুষের তৈরি এই ভুল তথ্যের স্রোত কেবল প্রযুক্তি দিয়ে থামানো সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক নাগরিক সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। পরিশেষে, সত্যকে উপেক্ষা করার মূল্য যে কোনো সমাজকে চরমভাবে পরিশোধ করতে হয়—বাংলাদেশের ডিজিটাল বাস্তবতায় এই ধ্রুব সত্যটি উপলব্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

