বাবার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয়েছিল কঠোর জীবনসংগ্রাম। নিজেদের শেষ সম্বল ধানের জমি বিক্রি করে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়েছেন মা। সেই অদম্য চেষ্টাই অবশেষে ফল দিয়েছে। নোয়াখালীর জান্নাতুল আরফিন এবার ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সফল হয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে এই আনন্দের মাঝেও এখন দুশ্চিন্তা ভর করেছে পরিবারটির ওপর—মেডিকেল কলেজে ভর্তি, বইপত্র ও দীর্ঘদিনের পড়াশোনার বিপুল খরচ কীভাবে নির্বাহ হবে।
জান্নাতুল আরফিন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের কইয়াজলা গ্রামের প্রয়াত আব্দুল ওয়াদুদ ও শাহিদা আক্তার দম্পতির বড় মেয়ে। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনিই সবার বড়।
আট বছর আগে জান্নাতুল আরফিন যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন, তখনই তিনি বাবাকে হারান। এরপর থেকেই পরিবারটির ওপর নেমে আসে অভাবের ঘোর অন্ধকার। মা শাহিদা আক্তার সেলাই মেশিনের কাজ করে, টিউশনি করিয়ে এবং আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় চার সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যান। মেয়েদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্য তিনি পরিবারের শেষ সম্বল—স্বামীর ভাগে পাওয়া মাত্র ৫ শতাংশ ধানের জমিও বিক্রি করে দেন। ২০২৩ সালে তিন লাখ টাকায় সেই জমি বিক্রি করে মেয়ের কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাব্যয় মেটানো হয়।
জান্নাতুল আরফিন সেনবাগ উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের গাজীরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। আর্থিক সংকটের কারণে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও, আত্মীয়দের সহায়তায় তিনি ফেনীর জিয়া মহিলা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ লাভ করেন।
এইচএসসি পাসের পর মেডিকেল ভর্তির প্রস্তুতি ছিল আরও কঠিন। প্রথম দফায় কোচিংয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। মায়ের জমি বিক্রির আত্মত্যাগ তাকে আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে। পরবর্তীতে দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেন শাহিদা আক্তার। কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসের ফলস্বরূপ, জান্নাতুল আরফিন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৪০৪১তম স্থান অর্জন করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ লাভ করেন।
মেয়ের সাফল্যে আরফিনের মা শাহিদা আক্তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “মেয়ের বাবাকে হারানোর পর খুব কষ্টের মধ্যে দিন কেটেছে। অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালানো কঠিন ছিল। তবুও আরফিন কখনো হাল ছাড়েনি। আজ তার এই সাফল্য আল্লাহর রহমত। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”
তবে নতুন করে আর্থিক দুশ্চিন্তা ভর করেছে তার কপালে। তিনি বলেন, “পরিবারের শেষ সম্বল ধানের জমি বিক্রি করে মেয়েকে কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছি। এখন ভর্তি, বইসহ অনেক খরচ। সামনে কীভাবে পড়াশোনা চলবে, তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। আমার মেয়ে যেন মানুষের মতো মানুষ হতে পারে, এই দোয়া করি।”
জান্নাতুল আরফিন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “স্বপ্নের মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। অষ্টম শ্রেণিতে বাবাকে হারানোর পর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয়। আমার পড়াশোনার জন্য মা জমি বিক্রি করেছেন। এই বিষয়টি আমাকে আরও বেশি দায়িত্বশীল করেছে।” তিনি এখন ভর্তি ও পড়াশোনার ব্যয়ভার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
গাজীরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মানিক চন্দ্র মজুমদার জান্নাতুল আরফিনকে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আর্থিক সংকটে নতুন বই বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ না থাকলেও নিজের প্রচেষ্টায় এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা।”
বিদ্যালয়ের সভাপতি রবিউল হোসেন সুজন আরফিনের এই সফলতায় আবেগাপ্লুত। তিনি বলেন, “চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে আজ সে এই পর্যায়ে এসেছে। তার জন্য একটি দিনও সহজ ছিল না। অদম্য আরফিনকে অভিনন্দন ও স্যালুট। মানুষের মতো মানুষ হয়ে মানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা রইল।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জান্নাতুল আরফিন জানান, তিনি একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান।

