রাজনীতির মাঠে সহাবস্থান আর মতপার্থক্যের বেড়াজাল পেরিয়ে নতুন এক আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরতে গিয়ে তিনি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তার মতে, দলটির নেতাকর্মীদের বর্তমান কর্মকাণ্ড কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূতই নয়, বরং তা পুরো দেশকে এক ভয়ংকর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শরিফুল কবির মিলনায়তনে বাংলাদেশ পেশাজীবী অধিকার পরিষদের পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। শুক্রবার সন্ধ্যার এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত পেশাজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সামনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের ভাবনা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন এই তরুণ প্রতিমন্ত্রী।
জামায়াতের সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে নিজের সহানুভূতি ও ভালো লাগার কথা স্বীকার করে নেন নুরুল হক নুর। তবে দলের আদর্শ এবং বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, আবেগের জায়গাটি এক জিনিস আর রাষ্ট্রের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো অনেকাংশেই একটি অসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রূপ নিয়েছে। ফেসবুকে ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে দলটির নিয়োজিত সাইবার বাহিনী যেভাবে আক্রমণ চালায়, তাতে সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মীও এখন মুখ খুলতে ভয় পান।
সাইবার ট্রল এবং নিয়মতান্ত্রিক আক্রমণের এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন তিনি। নুর বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেকোনো সুস্থ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু একটি দল বা তাদের সমর্থকরা যখন ভুয়া আইডি খুলে চরম অশালীন ভাষা ব্যবহার করে এবং সুপরিকল্পিতভাবে বিরোধীদের চরিত্রহনন করে, তখন তাকে কোনোভাবেই আদর্শের রাজনীতি বলা চলে না।
ইসলামের শান্তির বার্তা ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুমহান আদর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যারা ইসলামি রাজনীতি করার দাবি করেন, তাদের প্রতিটি আচরণে সেই আদর্শের প্রতিফলন থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ভার্চুয়াল জগতের এই সাইবার সন্ত্রাস রোধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অংশীজন ও মিত্র দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন নুরুল হক নুর। তিনি মনে করেন, বিগত দিনে রাজপথের কঠিন লড়াইয়ে যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাদের অবদান কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া চলবে না। মিত্রদের যথাযথ মূল্যায়ন না করলে তা সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকারের অন্দরে মিত্রদের মধ্যে ক্ষোভ বা দূরত্ব তৈরি হলে তার সুযোগ নিতে পারে কুচক্রী মহল। বিগত দিনের সেই সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সংকটকালে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাদের মূল্যায়ন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের ভেতরে গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য শরিক দলগুলোর অংশীদারিত্বের বিষয়টিও তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এবং তার দল গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলা কুৎসা ও অপপ্রচারের তীব্র জবাব দেন এই প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এসব ভিত্তিহীন অপপ্রচারে তারা কখনো বিচলিত বা পিছু হটবেন না। স্বচ্ছ রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কেউ দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
সাধারণ পরিবারের সন্তান হিসেবে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতিতে আসার কথা উল্লেখ করে নুর বলেন, সাধারণ মানুষের দেওয়া অনুদান বা সহায়তায় তাদের দল চলে। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে কোনো সুবিধা নেওয়ার বা দুর্নীতির একটিমাত্র অভিযোগও প্রমাণ করতে পারে, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রীত্ব ও দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর আগের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে গভীর শঙ্কার কথা জানান নুরুল হক নুর। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক তৎপরতা দেশে নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সেই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় গণঅধিকার পরিষদ সবসময় জনগণের কাতারে থেকে রাজপথে জোরালো ভূমিকা পালন করবে।
দেশের যেকোনো অন্যায় বা অঘটনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই রাজনৈতিক নেতা। তিনি বলেন, তারা কথা বলার মানুষ। দেশের স্বার্থে কোনো ভুল বা অঘটন দেখলে তারা কখনো চোখ বুজে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারেন না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যেখানেই প্রয়োজন হবে, তারা সত্যের পক্ষে কথা বলেই যাবেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পেশাজীবী অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন। সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই আলোচনা সভাটি বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাইবার অপপ্রচার রোধ এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনার এই দাবি এখন সব মহলেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

