দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমশ উত্তাপ বাড়ছে। বিরোধী দলগুলো যখন এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সমাধানের পথ বাতলে দিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কেবল রাজপথে স্লোগান দিয়ে বা আন্দোলনের হুমকি দিয়ে এই জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিকল্পনা, যা সংসদে উপস্থাপন করা উচিত।
শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই সময়োপযোগী মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক উপলক্ষে এই বর্ণাঢ্য সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের ওপর আলোকপাত করেন। সেখানে তিনি রাজপথের উত্তাপের চেয়ে সংসদের গঠনমূলক বিতর্কের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।
রিজভীর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের কাজ কেবল সরকারের অন্ধ সমালোচনা করা নয়। জাতীয় সংকটের সময় জাতিকে পথ দেখানোর দায়িত্ব তাদেরও রয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো একটি চরম সংবেদনশীল বিষয়ে যখন দেশ ধুঁকছে, তখন বিরোধী দলের উচিত জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের নিজস্ব রূপরেখা বা রোডম্যাপ উপস্থাপন করা। তারা যদি মনে করেন সরকারের নীতিতে ভুল রয়েছে, তবে সেই ভুল শুধরে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তার যৌক্তিক হিসাব তাদের দেওয়া উচিত।
বিরোধী দলগুলোর ডাকা সম্ভাব্য লংমার্চ ও অন্যান্য কর্মসূচির প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, বিরোধী দলের কর্মসূচি দেওয়ার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। তবে শুধু কর্মসূচি দিয়ে একটি পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা দেশ ও দশের জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হতে পারে না। বরং কোথা থেকে গ্যাস আসবে, কীভাবে উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থায়ন কীভাবে হবে—সেই বিকল্প পথটি তাদের স্পষ্ট করে দেশবাসীকে জানাতে হবে।
সংকটের নেপথ্যে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অতীতের ভুল
জ্বালানি সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক—উভয় প্রেক্ষাপটই অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান সরকার ইচ্ছা করে মানুষকে অন্ধকারে রাখছে না। বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণেই বাংলাদেশ আজ এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এটি কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের নিজস্ব বা একক সৃষ্টি নয়।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কথা উল্লেখ করে রিজভী জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারেই এলএনজি ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। চাইলেই রাতারাতি এই বৈশ্বিক সংকট এড়িয়ে সস্তায় জ্বালানি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি তিনি বিগত সরকারের ভ্রান্ত ও অদূরদর্শী নীতিকেও এই পরিস্থিতির জন্য সমানভাবে দায়ী করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরাও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর এলএনজি এবং ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে। রিজভীও তার বক্তব্যে সেই পুরোনো ও ভুল পরিকল্পনার মাশুল গোনার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসেন।
দেশের জ্বালানি খাতকে একটি টেকসই কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হলে বিগত সরকারের সেই আমদানিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। তবে রাতারাতি সেই কাঠামো পরিবর্তন করাও অসম্ভব। রিজভী তাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীত সরকারের অপরিকল্পিত পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি ঘটলে দেশের অর্থনীতি আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। তাই এখন প্রয়োজন সব দলের সম্মিলিত প্রজ্ঞা ও ধৈর্য।
সংসদীয় রাজনীতির চর্চা ও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার
সংকট নিরসনে রাজপথের বদলে সংসদকে বেছে নেওয়ার যে আহ্বান রিজভী জানিয়েছেন, তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তিনি বিরোধী দলকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংসদে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রয়েছেন এবং সেখানে কথা বলার অফুরন্ত সুযোগও তাদের আছে। সরকারের সমালোচনা করা এবং ভুল ধরিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য চর্চা। কিন্তু সেই সমালোচনার ভাষা হওয়া উচিত গঠনমূলক ও তথ্যনির্ভর।
শুধু রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য রাজপথে উত্তেজনা ছড়ানো কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের কাজ হতে পারে না। কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র বা পলিসি পেপার বিরোধী দল সংসদে উপস্থাপন করতে পারে। সেখানে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করবেন, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি খণ্ডন হবে এবং চূড়ান্তভাবে দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্তটি গৃহীত হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো এই পারস্পরিক মতবিনিময়।
অনেকেই মনে করছেন, রিজভীর এই বক্তব্য বিরোধী দলের প্রতি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জও বটে। কারণ রাজপথে জনতাকে উত্তেজিত করা যতটা সহজ, সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির জটিল সমীকরণ মিলিয়ে বিকল্প বাজেট বা জ্বালানি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা ততটাই কঠিন। তিনি বিরোধী দলকে সেই কঠিন কাজটি করার জন্যই আহ্বান জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাতের বদলে প্রতিযোগিতার এক সুস্থ পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও শিল্পীদের সাহসী ভূমিকা
বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার এই আয়োজনে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি উঠে আসে সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। জুলাই মাসের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রুহুল কবির রিজভী। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে শুধু ছাত্র বা রাজনীতিকরাই নন, দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষদের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল।
বুলেট, টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের আতঙ্কের মধ্যেও যখন রাজপথ প্রকম্পিত হচ্ছিল, তখন শিল্পীরা তাদের গান, কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের মধ্যে এক অদম্য উদ্দীপনা ও সাহস তৈরি করেছিলেন। রিজভী অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, শিল্পীদের সেই প্রতিবাদী ভাষা সাধারণ মানুষের মনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিতে বড় ধরনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। একটি জাতির ক্রান্তিলগ্নে সংস্কৃতির এই জাগরণ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ফ্যাসিবাদের পতন ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংস্কৃতিকর্মীদের এই অবদানকে কখনোই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য অতিথিরাও এই দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি ফারহানা বেবী তার বক্তব্যে শিল্পীদের অধিকার আদায় ও একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন। একটি সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক জাগরণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণের প্রত্যাশা
শিল্পকলা একাডেমির এই অনুষ্ঠানে রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল। সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই আয়োজনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেন। এছাড়া বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল, প্রখ্যাত চিত্রনায়ক হেলাল খান, এবং জাকির হোসেন রুকনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংস্কৃতিকর্মীরা এখন একই মঞ্চে কাজ করতে প্রস্তুত।
গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো একটি জাতীয় সংকট নিয়ে সাংস্কৃতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে রিজভীর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, রাজনীতি এখন আর কেবল ড্রয়িংরুম বা দলীয় কার্যালয়ের চার দেয়ালে বন্দি নেই। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আর তাই এই সমস্যার সমাধানও খুঁজতে হবে সম্মিলিতভাবে, যেখানে রাজনীতিবিদের প্রজ্ঞা এবং সাধারণ মানুষের ধৈর্য—উভয়ই সমানভাবে জরুরি।
পরিশেষে, রাজপথের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পরিহার করে সংসদে মেধাভিত্তিক বিতর্কের যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা যদি বিরোধী দলগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। সংকট আসবে, কিন্তু সেই সংকট মোকাবিলার পদ্ধতিই নির্ধারণ করবে একটি জাতি হিসেবে আমরা কতটা পরিপক্ব। গ্যাস-বিদ্যুতের এই সাময়িক আঁধার কেটে যাবে, তবে সেই আঁধার কাটাতে প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত ও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় উদ্যোগ, কোনো হঠকারী রাজনৈতিক বিভাজন নয়।

