বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাঠামোগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং আস্থার সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক নেতারা। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা একমত হন যে, ভুল ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, ভুয়া ওষুধ, দুর্বল তদারকি এবং বিদ্যমান আইনের উদাসীন বাস্তবায়ন জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
সেমিনারে উঠে আসা প্রধান সমস্যা ও সমাধানের দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ স্বাগত বক্তব্যে বলেন, দেশে মানসম্মত ও রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিতে এখনো কাঠামোগত ঘাটতি প্রকট। তিনি স্বাস্থ্যখাতের প্রধান দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেন:
স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ। সরকারি-বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা মানের চরম অসমতা। মানবসম্পদের ঘাটতি, অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ফার্মেসির ব্যাপক সম্প্রসারণ। ভুয়া ওষুধ ও তদারকি দুর্বলতা। আইন বাস্তবায়নে উদাসীনতা জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও আস্থাকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিসিসিআই-এর প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী জানান, বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতের বাজার প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে প্রায় ৪৯ শতাংশ জনগণ গুণগত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। তিনি স্বল্প বাজেট বরাদ্দ, শহর-গ্রামে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, সেবার মান ও আস্থার ঘাটতি এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটকে অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বক্তারা জানান, তুলনামূলক ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার লক্ষ্যে জনগণের একটি বড় অংশ প্রতি বছর অন্যান্য দেশে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে, যার ফলে প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই চিত্র স্বাস্থ্যখাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে জনগণের আস্থার ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।
প্রধান অতিথি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান, স্বাস্থ্যখাতে অর্জন স্বীকার করলেও সামগ্রিকভাবে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে। তিনি জোর দেন:
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (Primary Health Care) এর উপর বেশি হারে জোর দিতে হবে। ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল হেলথ কেয়ার কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ সম্ভব। চিকিৎসা শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রিন লাইফ সেন্টারের চিফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক সরকারি হাসপাতালগুলোর সর্বোত্তম মান উন্নয়ন ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উপর জোর দেন।
তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিমা ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবহার না থাকার কারণে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ ব্যক্তিকে নিজস্ব ব্যয়ে বহন করতে হয়। এই পরিস্থিতি নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে।
একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বক্তারা নিম্নোক্ত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান: বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব: সামগ্রিক খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ সহায়তা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) জোরদার করা। মানবসম্পদ উন্নয়ন: আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, নার্সিং, ল্যাব সায়েন্স ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল উন্নয়ন করা।
নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা: বিদ্যমান স্বাস্থ্য নীতি (২০১১) দ্রুত যুগোপযোগী করা এবং স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মো. জাকির হোসেন জানান, স্থানীয়ভাবে ৯৭ শতাংশ ঔষধ উৎপাদিত ও ১৬০টি দেশে রপ্তানি হলেও, স্বাস্থ্য নীতি ১৪ বছরেও যুগোপযোগী হয়নি।
প্রশাসনিক সুবিধা: লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে ‘ওয়ান-স্টপ সেবা’ প্রবর্তন করা এবং বিদেশি দক্ষ টেকনিশিয়ান ও নার্স এনে দেশীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে বিদ্যমান নীতিগত প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা।
আস্থা বৃদ্ধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, আস্থা বাড়াতে সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে রোগীদের যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক নেতিবাচক সংবাদ পরিহার করা প্রয়োজন।
বক্তারা সর্বসম্মতভাবে মত দেন যে, এই খাতের আস্থা ফেরাতে সরকার, বেসরকারি খাত ও জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে এবং দেশের ক্রমবর্ধমান বাজারকে কাজে লাগাতে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

