২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে এখন তুমুল আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই পরীক্ষাগুলো ডিসেম্বরে শেষ করার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও তার তীব্র বিরোধিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—হুট করে পরীক্ষার সময় কয়েক মাস এগিয়ে আনা শিক্ষার্থীদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। অধিকাংশের মতে, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলে নেওয়াটাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত হবে। তারা মনে করেন, হুট করে চার মাস সময় কমিয়ে দিলে শিক্ষার্থীদের ওপর যে মানসিক ও একাডেমিক চাপ তৈরি হবে, তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে এলোমেলো হয়ে যাওয়া শিক্ষাপঞ্জি ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই ছিল সরকারের মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই ২০২৭ সালের পরীক্ষাগুলো বছরের শেষভাগে অর্থাৎ ডিসেম্বরে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতির কথা বিবেচনা করে এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জোরালো ইঙ্গিত মিলছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সিলেবাস শেষ করে রিভিশন দেওয়ার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন, ডিসেম্বরে পরীক্ষা হলে তারা সেই সুযোগ হারাবেন। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এই প্রস্তাবে বেশি উদ্বিগ্ন। তাদের দাবি, ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়া হলে তাদের প্রায় অর্ধেক বছর সময় কম দেওয়া হচ্ছে, যা পাবলিক পরীক্ষার মতো বড় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক।
শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগের সাথে একমত পোষণ করেছেন। রাজধানীর অভিজ্ঞ কয়েকজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান সভায় বলেন, একাডেমিক ক্যালেন্ডারের সাথে পরীক্ষার সময়ের একটি স্বাভাবিক ছন্দ থাকা জরুরি। প্রতি বছর এক মাস করে এগিয়ে এনে ধীরে ধীরে সময় সমন্বয় করা যেতে পারে, কিন্তু এক বছরেই চার মাস কমিয়ে আনা কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে সব পক্ষের যুক্তি শুনেছেন এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমরা কোনো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে বিশ্বাসী নই। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের উদ্বেগকে আমরা সম্মান জানাই। ২০২৭ সালেই কি সব সমন্বয় হবে, নাকি ২০২৮ সাল পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব—তা নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।”
মন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেই মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট এবং চূড়ান্ত গাইডলাইন প্রকাশ করবে মন্ত্রণালয়। সরকারের লক্ষ্য কেবল পরীক্ষা নেওয়া নয়, বরং একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বৈঠকে কৌশলগত কিছু দিক তুলে ধরেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী। তিনি ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসেন। তিনি জানান, ২০২৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এসএসসি পরীক্ষা শুরু করা গেলে রোজার আগেই তা সুন্দরভাবে শেষ করা সম্ভব হবে।
এই প্রস্তাবটিকে অনেক অভিভাবক ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শীতকালীন ছুটির পর জানুয়ারিতে পরীক্ষা শুরু হলে শিক্ষার্থীরা শান্ত মনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আবার রোজার সময় পাবলিক পরীক্ষা চলাকালীন যে যাতায়াত ও শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হয়, তা থেকেও শিক্ষার্থীরা রেহাই পাবে।
অন্যদিকে, এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভিন্নধর্মী প্রস্তাব এসেছে। রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক তামান্না বেগম যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এসএসসি পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলেও এইচএসসির জন্য শিক্ষার্থীদের হাতে পর্যাপ্ত সময় রাখা দরকার। তার মতে, এইচএসসি পরীক্ষা মার্চ বা এপ্রিলে নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাবে।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, পাবলিক পরীক্ষার সময় পরিবর্তনের সাথে কেবল শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নয়, বরং উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা জড়িয়ে থাকে। ডিসেম্বরে পরীক্ষা নিলে ফলাফল প্রকাশ হতে হতে মার্চ মাস হয়ে যাবে, যা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। এই কারণেই জানুয়ারি-এপ্রিলের চক্রটিকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায়ের অধিকাংশ মতামতই জানুয়ারিতে এসএসসি এবং এপ্রিলে এইচএসসি নেওয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, “আমরা যদি হুট করে সময় কমিয়ে দেই, তবে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আমরা একটি ধীরস্থির সমন্বয়ের পথে হাঁটতে চাই।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাবিনা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সুপারিশ এখন টেবিলে রয়েছে। এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে একটি খসড়া তৈরি করা হবে, যা খুব দ্রুতই চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। তিনি আশা করছেন, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই দেশবাসী এ বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাবেন।
উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার সময় পরিবর্তন—সবকিছুই করা হয়েছে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে। তবে ২০২৭ সালকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষাপঞ্জি আবার তার চিরচেনা রূপে ফেরার চেষ্টা করছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের একজন প্রতিনিধি সভায় বলেন, “আমরা চাই না আমাদের সন্তানরা কোনো গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হোক। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন যেন ব্যাহত না হয়। জানুয়ারিতে এসএসসি নেওয়ার প্রস্তাবটি আমাদের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।”
বিকেলে সভা শেষ হওয়ার পর সচিবালয় চত্বরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে অনেক শিক্ষকও স্বস্তির কথা জানান। তাদের মতে, সরকার যদি শেষ পর্যন্ত জানুয়ারি-এপ্রিলের ফর্মুলা গ্রহণ করে, তবে তা হবে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি যেমন শিক্ষা ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের ওপর পাহাড়সম মানসিক চাপও তৈরি করবে না।
শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করলেই চলবে না, সেই অনুযায়ী ক্লাস এবং পরীক্ষার মধ্যবর্তী বিরতিগুলোকেও ঢেলে সাজাতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণের পর যেন অন্তত দুই মাস সময় হাতে থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা নিলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না।
বর্তমান সরকারের শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি কেবল সেই বছরের জন্য নয়, বরং পরবর্তী কয়েক বছরের শিক্ষাপঞ্জির একটি কাঠামো তৈরি করে দেবে। তাই সরকারের এই সতর্ক অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সংলাপ একটি বড় পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, অধিকাংশের মতামত অর্থাৎ জানুয়ারি ও এপ্রিলের প্রস্তাবটিই চূড়ান্তভাবে গৃহিত হয় কি না। দেশের লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে পাওয়া আভাস অনুযায়ী, সরকার খুব সম্ভবত জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জানুয়ারি এবং এপ্রিলের প্রস্তাবটিকেই বেছে নিতে যাচ্ছে। এটি কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের অসংলগ্নতা কাটিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আবার একটি স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল ধারায় ফিরবে বলে আশা করা যায়।

