কাঁটাতারের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও আলোচনায় ফেনীর ফুলগাজী সীমান্ত। তবে এবার কোনো সংঘর্ষ বা উত্তজনা নয়, বরং এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির নিথর দেহের পরিচয় শনাক্ত ঘিরে দিনভর চলল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। সীমান্তবর্তী এলাকায় পড়ে থাকা যে মরদেহের ছবি তুলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে পাঠানো হয়েছিল পরিচয়ের আশায়, শেষ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ফেনীর ফুলগাজী থানা পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ওই ব্যক্তির নাম বিশ্বজিৎ সরকার। ৬১ বছর বয়সী বিশ্বজিৎ চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ওই গ্রামের মৃত গোপাল সরকারের ছেলে। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার ধোঁয়াশা কাটিয়ে রাতে তার স্বজনরা ফুলগাজী থানায় এসে মরদেহটি শনাক্ত করেন।
ঘটনার শুরু বৃহস্পতিবার সকালে। ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের কামাল্লার সীমান্ত এলাকায় স্থানীয়রা এক প্রৌঢ়ের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সাবেক ইউপি সদস্য জানু মেম্বারের বাড়ির পশ্চিম পাশে এবং মিয়াচান হুজুরের মুরগির খামারের ঠিক দক্ষিণ দিকে ঘাসের ওপর নিথর দেহটি পড়ে ছিল। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে ওই ব্যক্তিকে চিনতে না পারায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে এবং মরদেহটি থানায় নিয়ে আসে। যেহেতু এলাকাটি সীমান্তের একদম কাছে, তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল নিহিত ব্যক্তি ওপার থেকে আসতে পারেন। সেই সন্দেহ থেকেই পরিচয় নিশ্চিত হতে বিএসএফকে ছবি পাঠানো হয়েছিল।
সীমান্তের ওপারে ছবি পাঠিয়েও যখন কয়েক ঘণ্টায় কোনো সাড়া মিলছিল না, তখন পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তা নেয়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া সেই ছবি দেখেই আঁতকে ওঠেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের এক পরিবার। বিশ্বজিতের শ্যালক রাজন সরকার দ্রুত ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন এবং থানায় পৌঁছে নিশ্চিত করেন যে, এটিই তার হারানো বোন জামাই।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বজিৎ সরকার দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। দারিদ্র্যের ঘানি টানতে প্রবাস জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি ওপারেই কাটিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে নিজ দেশে ফেরার এক বুক আকুতিই হয়তো তাকে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়ে এসেছিল।
নিহতের শ্যালক রাজন সরকার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তার বোন জামাই ভারতে কাজ করার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তার ধারণা, অসুস্থ অবস্থায় আইনি জটিলতা এড়াতে বা দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়নায় তিনি হয়তো অবৈধভাবে তারকাঁটা পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে পথেই তার মৃত্যু হয় নাকি বাংলাদেশে ঢোকার পর তিনি প্রাণ হারান, তা এখনো অস্পষ্ট।
স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, তারকাঁটা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতায় বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে ভিন্ন কথা। মরদেহের বাহ্যিক পরীক্ষায় কোনো গুরুতর আঘাত বা বুলেটের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা সীমান্ত হত্যার প্রচলিত ঘটনার চেয়ে একে আলাদা করেছে।
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মিজানুর রহমান জানান, সকালে খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ তৎপরতা শুরু করে। তিনি বলেন, “মরদেহে বড় ধরনের কোনো জখম বা মারধরের চিহ্ন আমরা দেখিনি। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করি। বিকেলেই মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন যে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। বর্তমানে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে পুলিশ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
সীমান্তবর্তী এই গ্রামগুলোতে প্রায়ই পরিচয়হীন মানুষের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে যারা পাসপোর্ট ছাড়া পারাপার করেন, তাদের জীবনের ঝুঁকি থাকে পদে পদে। বিশ্বজিতের ঘটনাটি আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কড়াকড়ি আর আইনি জটিলতার গ্যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়েন।
এদিকে, বিএসএফের পক্ষ থেকে কেন কোনো দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়নি, সে বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের ঘটনায় অনেক সময় পতাকা বৈঠকের প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ। তার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্রুত ফল দিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বজিতের মৃত্যুতে তার নিজ গ্রাম রূপসায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন পর তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল, কিন্তু তিনি ফিরলেন কফিনে বন্দী হয়ে। রাতে তার মরদেহ নিয়ে স্বজনরা চাঁদপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সেখানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, সীমান্তে পড়ে থাকা প্রতিটি লাশের পেছনে থাকে এক একটি যন্ত্রণাদায়ক গল্প। বিশ্বজিৎ সরকারের মৃত্যু যদি অসুস্থতাজনিত কারণেও হয়, তবুও তার অবৈধ্য পথে প্রবেশের চেষ্টার নেপথ্যে থাকা সামাজিক ও প্রশাসনিক কারণগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। কেন একজন বৃদ্ধকে অসুস্থ শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁটাতার পার হতে হলো, সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়।
ফুলগাজীর স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই এলাকাটি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও মাঝেমধ্যেই অপরিচিত মানুষের চলাচল দেখা যায়। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও রাতের আঁধারে কিছু মানুষ যাতায়াত করার চেষ্টা করেন। বিশ্বজিতের ঘটনাটি সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ তৈরি করেছে।
ফেনী জেনারেল হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা এবং দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তি তার মৃত্যুর সহায়ক কারণ হতে পারে। তবে ভিসেরা রিপোর্ট বা বিস্তারিত ময়নাতদন্তের পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে তার পাকস্থলীতে বিষক্রিয়া বা অন্য কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল কি না।
পরিশেষে, বিএসএফের সাড়া না দেওয়া কিংবা বিজিবির অপেক্ষা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন শোকাতুর পরিবারটি। তারা চান অন্তত শান্তিতে বিশ্বজিতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে। আর পুলিশ প্রশাসন চাইছে সীমান্ত এলাকায় মানুষের চলাচলকে আরও শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে, যাতে এমন অকাল মৃত্যুর খবর আর কোনো পরিবারের দরজায় না কড়া নাড়ে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্ত পার হওয়ার সময় বিশ্বজিতের সাথে অন্য কেউ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো দালাল চক্র তাকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে রেখে যায়, তবে তাদের খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ, অসুস্থ মানুষকে এভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়াও একটি বড় ধরনের অপরাধ।
৭ মে’র এই বিষাদময় সন্ধ্যাটি ফেনীবাসীর কাছে হয়তো আরও একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে, কিন্তু চাঁদপুরের সেই ছোট্ট গ্রামটির জন্য এটি একটি অপূরণীয় ক্ষতি। কাঁটাতারের সীমান্তের বাস্তবতা যে কতটা রূঢ়, বিশ্বজিৎ সরকারের নিথর শরীর যেন আজ সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে।

