সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কের পিচঢালা পথ আজ আরও একবার রক্তে রঞ্জিত হলো। সোমবার দুপুরে ছাতক উপজেলার জালালপুর এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের তিনজনসহ মোট পাঁচজন। সাজানো একটি সংসার মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেছে ঘাতক বাসের বেপরোয়া গতির চাকায়।
দুর্ঘটনার খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিহতের গ্রাম তাহিরপুরের তিওর জালালে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যারা সকালে হাসিিমুখে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, সন্ধ্যায় তাদের নিথর দেহ কফিনে বন্দি হয়ে ফেরার প্রতীক্ষায় স্বজনরা। আর্তনাদ আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তাহিরপুর উপজেলার তিওর জালাল গ্রামের ইউসুফ আলী এবং তার দুই কন্যা নিলুফা আক্তার (৩০) ও কেয়া মনি (১৭)। এই মর্মান্তিক তালিকায় আরও রয়েছেন ইউসুফ আলীর ভাতিজি জামাই শাহাব উদ্দিন। তবে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অটোরিকশাটির চালকের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আলী নেওয়াজ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ইউসুফ আলী তার দুই মেয়ে ও আত্মীয়কে নিয়ে জরুরি প্রয়োজনে সিলেট যাচ্ছিলেন। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মহাসড়কের জালালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তাদের বহনকারী যানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার সময় ‘রিফাত পরিবহন’ নামক একটি যাত্রীবাহী বাস সিলেট থেকে সুনামগঞ্জের দিকে আসছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আসছিল এবং হঠাৎ করেই নিজের লেন পরিবর্তন করে বিপরীত দিক থেকে আসা অটোরিকশাটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি মূহূর্তের মধ্যে লোহার স্তূপে পরিণত হয়। রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে সেটি একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে যায়। এদিকে বাসটিও তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি। অটোরিকশাটিকে পিষে দিয়ে বাসটি সড়কের পাশের একটি গভীর খাদে উল্টে পড়ে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইউসুফ আলী ও অটোরিকশা চালক। রক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তা থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় নিলুফা, কেয়া ও শাহাব উদ্দিনকে উদ্ধার করে দ্রুত সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তাদের বাঁচাতে। কিন্তু আঘাতের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যার দিকে একে একে তিনজনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই খবর যখন গ্রামে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক বাসের চালক ও তার সহকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাসটি জব্দ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার জানান, পুলিশ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং ঘাতক চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কটি ইদানীং যেন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চালকদের বেপরোয়া গতি আর ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে মহাসড়কগুলোতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে বলে তাদের দাবি।
জালালপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই পয়েন্টে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু আজকের মতো এমন বিভীষিকাময় দৃশ্য তারা আগে খুব কমই দেখেছেন। একজন বাবা তার দুই সন্তানকে নিয়ে চোখের পলকে চিরতরে হারিয়ে যাবেন, তা কল্পনাও করতে পারছেন না কেউ।
সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে সরব থাকা কর্মীরা বলছেন, ফিটনেসবিহীন যান আর অদক্ষ চালকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়। একটি ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে নিরপরাধ মানুষদের, যাদের স্বপ্নগুলো মহাসড়কের ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর সুনামগঞ্জ ও সিলেটে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। নিহতদের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে এলাকায় হাজারো মানুষের ভিড় জমেছে।
নিহত নিলুফা আক্তার ও কেয়া মনির স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে বাবার মুখ উজ্জ্বল করা। তাদের পড়াশোনা আর জীবন নিয়ে বাবারও ছিল অনেক পরিকল্পনা। কিন্তু রিফাত পরিবহনের একটি ভুল টার্ন আর বেপরোয়া গতি সব স্বপ্নকে কবরের দিকে ঠেলে দিল।
সুনামগঞ্জের এই ট্র্যাজেডি আবারও প্রশ্ন তুলছে মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে। কেবল শোক প্রকাশ আর মামলাতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে সমাধান? নাকি নিরাপদ সড়কের জন্য কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেবে সরকার? এই প্রশ্ন এখন পুরো সুনামগঞ্জবাসীর।
আজকের এই দুর্ঘটনা কেবল একটি সংখ্যা নয়—পাঁচটি প্রাণ, একটি আস্ত পরিবার আর অসংখ্য স্মৃতি। তাহিরপুরের সেই নিভৃত গ্রামে ইউসুফ আলীর বাড়িতে আজ রাতে আর উনুন জ্বলবে না। সেখানে কেবল বেজে উঠবে হারানো প্রিয়জনদের জন্য কান্নার শব্দ।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে স্থানীয়রা দাবি তুলেছেন, দোষী বাস চালককে যেন কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনা হয়, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন শূন্যতার মুখোমুখি হতে না হয়।
রাতের অন্ধকারে মহাসড়কগুলো যখন জনশূন্য হয়ে পড়ে, তখনো সেখানে রয়ে যায় রক্তের দাগ আর কিছু অব্যক্ত হাহাকার। জালালপুরের এই ভয়াবহ স্মৃতি অনেকদিন তাড়া করে বেড়াবে প্রত্যক্ষদর্শীদের। আর তাহিরপুরের মানুষের জন্য এই ৪ মে হয়ে থাকবে এক অভিশপ্ত ক্যালেন্ডারের পাতা।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা ও মহাসড়কে ডিভাইডার স্থাপনের দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের।

