বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির টানাপোড়েনের মাঝে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। মে মাসে দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিশেষ বার্তায় এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ফলে মে মাসের শুরু থেকে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন করে কোনো বাড়তি খরচের বোঝা চাপছে না।
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম এক দফা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সাধারণত প্রতি মাসেই বিশ্ববাজারের ওঠানামা বিবেচনা করে অভ্যন্তরীণ দাম সমন্বয় করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মে মাসেও প্রতি লিটার ডিজেল আগের নির্ধারিত ১১৫ টাকা দরেই বিক্রি হবে। একইভাবে অকটেনের দাম প্রতি লিটার ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকায় স্থির থাকছে।
গৃহস্থালি ও ক্ষুদ্র শিল্পে ব্যবহৃত কেরোসিনের দামও লিটারপ্রতি ১৩০ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। গত মাসের বর্ধিত মূল্যই এই মাসে কার্যকর থাকবে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসে দাম না বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত পরিবহন ও কৃষি খাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমের শেষ দিকে সেচ কাজে ডিজেলের ব্যাপক চাহিদার কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
পণ্য পরিবহনের খরচ সরাসরি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই মে মাসে তেলের দাম না বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজার অন্তত নতুন করে অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা কমছে।
তবে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। গত এপ্রিলে তেলের দাম এক লাফে বেশ অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তাতে দাম না কমায় অনেকের মনেই ক্ষোভ রয়েছে।
পরিবহন শ্রমিকদের মতে, তেলের দাম যদি এই পর্যায়ে স্থির থাকে, তবে ভাড়ার ওপর চাপ কমে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও যেন দ্রুত তা কার্যকর করা হয়, এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।
সরকার এখন থেকে ‘অটোমেটিক প্রাইসিং ফর্মুলা’ বা স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা কমলে দেশেও তার প্রতিফলন দেখা যায় মাসের শুরুতে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা এবং দেশীয় উৎপাদন সচল রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার অনেকটা অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
বাজেট ঘোষণার মাস সামনে রেখে এই ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারকে নীতিগতভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি বাজেটের ব্যয়ের ওপর পড়ে।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ডলারের বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কস্ট বিবেচনা করে এবার দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি দেশের সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
এদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরবরাহে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। দাম অপরিবর্তিত থাকায় ডিলার পর্যায়ে তেল মজুদের প্রবণতা কম থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
খুচরা বাজারে তেলের সঠিক দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। নির্দেশনার বাইরে বাড়তি দাম নেওয়ার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ ক্রেতারা অবশ্য আশা করছেন, ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে সরকার যেন দ্রুত ভোক্তাদের সেই সুফল পৌঁছে দেয়। কারণ জ্বালানির দামের ওপরই নির্ভর করে তাদের ডাল-ভাতের সংস্থান।
জ্বালানি তেলের এই স্থিতাবস্থা আগামী মাসের শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা একে স্বাগত জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে মে মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের পরিচয় দিল। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধি আগামী জুন মাসের জন্য কী বার্তা নিয়ে আসে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে তেলের দাম রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বৃহস্পতিবারের এই ঘোষণার পর তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মে মাসের প্রথম প্রহর থেকেই সারা দেশে এই অপরিবর্তিত মূল্য তালিকা কার্যকর হবে।
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলেও আশ্বস্ত করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। ফলে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকটের ভয় নেই বলে তারা দাবি করছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। অস্থির বাজারে এই টুকু স্বস্তিও সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় পাওয়া।
পরিশেষে, মে মাসে জ্বালানির দাম না বাড়ার খবরটি পরিবহন মালিক, কৃষক এবং সাধারণ চাকরিজীবী সবার জন্যই এক টুকরো সুসংবাদ হয়ে এসেছে। আগামী মাসগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

