সীমান্তের কাঁটাতার আর নাফ নদীর নোনা জলে এখন কেবলই শঙ্কার প্রতিধ্বনি। কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদী থেকে আবারও সাতজন বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। বৃহস্পতিবার দুপুরের এই ঘটনা সীমান্তে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে, যা সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
প্রতিদিনের মতোই জীবন-জীবিকার তাগিদে নাফ নদীতে জাল ফেলেছিলেন সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপের কয়েকজন মৎস্যজীবী। কিন্তু ফেরার পথে প্রকৃতির প্রতিকূলতার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল অস্ত্রের মুখে জিম্মি হওয়ার আতঙ্ক। দুটি ডিঙি নৌকাসহ তাদের সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ওপারে।
অপহৃত জেলেদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন সাবরাং নয়াপাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রহমান, আবদুল মতলব, গুরা মিয়া ও মো. হাসান। তাদের সঙ্গে ছিলেন শাহপরীর দ্বীপ ডেইলপাড়ার আহমদ আলী, নুরুল আবছার এবং আবদুর রহিম। এই সাতটি পরিবারের ঘরে এখন শুধুই আহাজারি আর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুল অপেক্ষা।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল ফয়েজ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জেলেরা মাছ ধরা শেষে উপকূলে ফেরার পথেই আরাকান আর্মির হাতে ধরা পড়েন। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ও অনিরাপত্তার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে খবর পাওয়ার পরপরই তৎপরতা শুরু করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট বিওপি কমান্ডারকে পরবর্তী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সীমান্তের এই অপহরণ নাটক নতুন কিছু নয়। গত কয়েক বছর ধরে নাফ নদী যেন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। মাছ ধরতে গিয়ে বিজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে বন্দী হওয়ার ঘটনা এখনকার নিত্যনৈমিত্তিক খবর। বিজিবির সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত দুই বছরেই অন্তত সাড়ে চার শতাধিক জেলেকে নাফ নদী থেকে তুলে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
পরিসংখ্যান বলছে, এই অপহৃতদের মধ্যে ২৩০ জনকে বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বাকিদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। তারা মিয়ানমারের দুর্গম অঞ্চলের বন্দীশালায় অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাফ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় বৃদ্ধ জেলে মোবারকের সাথে। তিনি বলেন, “নদী আমাদের মা, কিন্তু এই নদীই এখন আমাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপার থেকে কখন কারা এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পেটের দায়ে নদীতে নামি, কিন্তু ফেরার নিশ্চয়তা নিয়ে সংশয় থাকে সব সময়।”
এই অপহরণের ঘটনাটি কেবল সাতজন মানুষের জীবনই বিপন্ন করেনি, বরং পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জেলেরা নদীতে নামতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে স্থানীয় বাজারে মাছের সরবরাহ যেমন কমছে, তেমনি বাড়ছে মাছের দাম। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের পাতে প্রোটিনের টান পড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং আরাকান আর্মির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সীমান্তের এই উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশি নাগরিকদের এভাবে অপহরণ করা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, আরাকান আর্মি মাঝেমধ্যেই মুক্তিপণের দাবিতে এ ধরনের কাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মুক্তিপণের দাবি বা রাজনৈতিক এজেন্ডার কথা বিজিবির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধানে সীমান্তে টহল জোরদার করার দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়েও একই ধরনের বড় মাপের অপহরণের ঘটনা ঘটেছিল। তখন কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার পর কয়েক দফায় বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত দিয়েছিল মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মি। কিন্তু কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবারও একই অপতৎপরতা শুরু হওয়া সীমান্ত নিরাপত্তার দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
টেকনাফের উপজেলা প্রশাসন থেকেও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিজিবি ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। জেলে পরিবারগুলোর অভিযোগ, দিনের বেলাতেও এখন আর নাফ নদীতে যাওয়া নিরাপদ মনে করছেন না তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাফ নদী বাংলাদেশের সার্বভৌম এলাকা এবং এখানে মাছ ধরা জেলেদের আইনগত অধিকার। আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ না করার পরেও কেন বাংলাদেশি নাগরিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ হওয়া জরুরি। এর স্থায়ী সমাধান না হলে টেকনাফের মৎস্য শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
ঘটনার পর থেকে সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় এলাকাবাসী। নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় নারী ও শিশুরা নাফ নদীর মোহনায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছেন। প্রতিটি ডিঙি নৌকা ফিরে এলে তারা প্রিয় মুখগুলো খুঁজতে ছুটে যাচ্ছেন পাড়ে।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পতাকা বৈঠকের জন্য যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে ওপারের পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়ায় উদ্ধার প্রক্রিয়া মাঝে মাঝে দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়ে।
সবশেষে বলা যায়, নাফ নদীর এই রক্তক্ষরণ বা অপহরণ বন্ধ করতে হলে কেবল স্থানীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো সীমান্ত নীতি। সাতজন জেলের মুক্তি এবং তাদের পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনাই এখন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরাপদ সীমান্তে শান্তিতে জীবিকা নির্বাহ করতে পারা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। টেকনাফের এই জেলেরা যেন সেই অধিকার ফিরে পান, এবং নাফ নদী যেন আবারও প্রাণের সঞ্চারে মুখরিত হয়—এমনটাই এখন সাধারণ মানুষের কাম্য। প্রশাসনের তৎপরতা আর কূটনৈতিক সাফল্যই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে।

