খেলার মাঠের সবুজ ঘাস আর গ্যালারির তালি যাকে হাতছানি দিচ্ছিল, সেই মানুষটিই একদিন হয়ে উঠলেন অন্ধকার জগতের একচ্ছত্র অধিপতি। ৯০-এর দশকের প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবলার থেকে দেশের অপরাধ তালিকার দুই নম্বরে উঠে আসা খন্দকার নাইম আহমেদ টিটনের জীবনের যবনিকা ঘটল সেই অস্ত্রেরই গুলিতে, যা একসময় ছিল তাঁর ক্ষমতার উৎস।
গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন কেউ জানত না যে দেশের অন্যতম এক ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ অপরাধীর অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে টিটনকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে একাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
যশোর শহরের খড়কী এলাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া টিটনের এই পরিণতির খবর যখন তাঁর পৈতৃক ভিটায় পৌঁছায়, তখন সেখানে এক গুমোট পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বুধবার রাতে শহরের কারবালা জামে মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। এই সেই কারবালা এলাকা, যেখানে আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে টিটনের অপরাধ জীবনের এক বীভৎস অধ্যায় রচিত হয়েছিল।
টিটনের অপরাধে হাতেখড়ি অনেকটা পারিবারিকভাবেই। তাঁর বড় ভাই টুটুল ছিলেন ২০০০ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া কুখ্যাত সন্ত্রাসী। তাঁদের ভগ্নিপতি সাজেদুল ইসলাম ইমনও ঢাকার অপরাধ জগতের এক পরিচিত নাম। বড় ভাই ও ভগ্নিপতির হাত ধরেই ৯০-এর দশকের শুরুতে টিটন ফুটবলের মাঠ ছেড়ে হাতে তুলে নেন মারণাস্ত্র।
শুরুতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলেও দ্রুতই টিটন ও টুটুল ভাই নিজেদের স্বতন্ত্র এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। অস্ত্র ব্যবসা, টেন্ডারবাজি আর চাঁদাবাজিতে তাঁদের নাম তখন যশোর ও ঢাকায় সমার্থক হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এই দুই ভাই যশোর ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় আস্তানা গাড়েন। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও রাজধানীর একটি বড় অংশের অপরাধ জগত।
পুরানো নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র দশ মিনিটের ব্যবধানে দুই রাজনৈতিক কর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় টিটন ও টুটুলের নাম প্রথমবার ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সেই জোড়া খুনের নৃশংসতা আজও যশোরের মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। এরপর থেকেই টিটন হয়ে ওঠেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এক রহস্যময় মাফিয়া।
দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটানোর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুক্তি পান টিটন। ধারণা করা হচ্ছিল, হয়তো তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আবারও পুরনো নেটওয়ার্ক সচল করতে শুরু করেন। আর এই সক্রিয়তাই সম্ভবত তাঁর প্রতিপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে, যার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা গেল মঙ্গলবার রাতের হত্যাকাণ্ডে।
টিটনের জানাজায় উপস্থিত হয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন যশোরের সাবেক রেফারি ও ফুটবলার লাবু জোয়ার্দার। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “টিটন খুব প্রতিভাবান ফুটবলার ছিলেন। মাঠের নৈপুণ্য দিয়ে তিনি সবার নজর কেড়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি যে পথে পা বাড়ালেন, তার শেষটা এমনই হওয়ার কথা ছিল।”
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানিয়েছেন, টিটন যে এ অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন তা পুলিশের রেকর্ডে স্পষ্ট। তবে দীর্ঘ সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করায় এবং সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ায় তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছিল। ঢাকায় হওয়া এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এখন তাঁর নেটওয়ার্কের অন্য সদস্যদের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
টিটনের এই রক্তক্ষয়ী প্রস্থান কেবল একজন অপরাধীর মৃত্যু নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। ফুটবলার থেকে মাফিয়া ডন হয়ে ওঠার এই বিয়োগান্তক গল্পটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধ জগতের সেই অন্ধকার দিকটিকেই উন্মোচিত করে, যেখানে প্রবেশের পথ থাকলেও ফেরার পথটি সবসময়ই রুদ্ধ থাকে।
যশোরের সাধারণ মানুষের কাছে টিটন ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। তাঁর মৃত্যুতে জনমনে এক ধরনের স্বস্তি ফিরলেও, যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা যেন নতুন কোনো ‘টিটন’ জন্ম না দেয়, সেটিই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ। অপরাধের যে চাবিকাঠি টিটন তাঁর হাতে রেখেছিলেন, তা এখন কার হাতে যায়—সেদিকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন গোয়েন্দারা।
নিহত টিটনের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, তাঁর দীর্ঘ অপরাধ জীবনের তালিকা এবং অসংখ্য মামলার বোঝা নিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফিরতে হয়েছে মাটির ঘরেই। যে ঢাকার রাজপথ তিনি কাঁপিয়েছেন কয়েক দশক ধরে, সেই ঢাকার রাজপথেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এক নিঃসঙ্গ মৃতদেহ হিসেবে।
আজকের এই আধুনিক যুগেও যেখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, সেখানে টিটনের মতো একজন অপরাধীর এত দীর্ঘকাল দাপটের সাথে টিকে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত রাজপথেই গুলিতে প্রাণ হারানো আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনেকগুলো ছিদ্রকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অপরাধ জগত থেকে প্রস্থানের একমাত্র উপায় কি শুধুই মৃত্যু?—টিটনের নিথর দেহ যেন এই প্রশ্নটিই রেখে গেল।

