পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার কংক্রিটের স্থাপনাগুলো আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো। মঙ্গলবার বিকেলের তপ্ত রোদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে যখন ইউরেনিয়াম স্থাপনের কাজ শুরু হলো, তখন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করল পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর অভিজাত ক্লাবে। বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের এই মাইলফলকটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
মঙ্গলবার বিকেল ঠিক সাড়ে ৩টায় রূপপুর প্রকল্পের মূল এলাকায় এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জ্বালানি লোডিংয়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণটি উদযাপন করা হয়। এর মাধ্যমে কয়েক দশকের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করল। কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের কার্বনমুক্ত ও সবুজ জ্বালানি নিশ্চিত করার পথে সবচাইতে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্প এলাকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটির দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছিল রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় দুপুর আড়াইটায়, যেখানে দেশি-বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথিদের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে কেন্দ্র প্রাঙ্গণ। এরপর ঘড়ির কাঁটা যখন সাড়ে ৩টা স্পর্শ করল, তখনই শুরু হয় সেই কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি স্থাপন প্রক্রিয়া।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তাদের সঙ্গে ছিলেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা ‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এছাড়াও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধি এবং রুশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
এর আগে, সকালে রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ ১৮ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে করে সরাসরি রাশিয়া থেকে ঢাকায় অবতরণ করেন। ঢাকায় নেমে তিনি প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি হেলিকপ্টারযোগে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছান।
প্রকল্পের কারিগরি পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোড করার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে প্রথম ইউনিটটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।
উল্লেখ্য, এই মেগা প্রকল্পের যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) প্রথম ইউনিটের কার্যক্রম শুরুর লাইসেন্স এবং ৫২ জন বিশেষজ্ঞকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রদান করে। কিছু কারিগরি জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে মাঝখানে সময় কিছুটা পিছিয়ে গেলেও, শেষ পর্যন্ত সফলভাবে জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হওয়াকে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও প্রকৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এই বিশাল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পের দুটি ইউনিট থেকে সব মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটি কেবল দেশের বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাবে না, বরং শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর কেন্দ্রের এই যাত্রা কেবল একটি অবকাঠামোর উদ্বোধন নয়, এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ। রুশ প্রযুক্তিতে তৈরি এই কেন্দ্রটিতে নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউরেনিয়াম স্থাপনের মাধ্যমে আজ থেকে যে নতুন যাত্রার সূচনা হলো, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করবে বলেই সকলের প্রত্যাশা।

