গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরের পর হঠাৎ বদলে যাওয়া আবহাওয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জনজীবন। আজ রোববার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক বজ্রপাতে অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাইবান্ধা জেলা। সেখানে দুই শিশুসহ চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া সিরাজগঞ্জ ও জামালপুরে দুইজন করে এবং নাটোর, বগুড়া ও পঞ্চগড়ে একজন করে মারা গেছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন, যাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গায়। বাড়ির বারান্দায় খেলা করার সময় বজ্রপাতের শিকার হয় দুই শিশু ফুয়াদ ও রাফি। সম্পর্কে তারা আপন চাচাতো ভাই। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাদের গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলেও কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গাইবান্ধার অন্যান্য স্থানেও ঝরেছে প্রাণ। সাদুল্লাপুরের কামারপাড়ায় জমিতে কাজ করার সময় মিজানুর রহমান নামের এক যুবক এবং ফুলছড়ির চরাঞ্চলে আলী আকবর নামের এক কৃষক বজ্রপাতে প্রাণ হারান। ফুলছড়িতে আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও তার পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর জেলা থেকেও বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর এসেছে। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে দুইজন এবং জামালপুরে দুইজন কৃষি কাজ বা গবাদি পশু নিয়ে ফেরার পথে বজ্রাঘাতের শিকার হন। প্রকৃতির এই আকস্মিক তাণ্ডবে এলাকাগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মধ্যে নাটোরের সিংড়া, বগুড়ার গাবতলী এবং পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আকাশে মেঘ জমার কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হয় এবং কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায় এসব দুর্ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রকোপ এবং তীব্রতা উভয়ই বেড়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক এবং টিনের চালের নিচে থাকা মানুষরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে আগেই ঝোড়ো বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বজ্রপাত নিয়ে পর্যাপ্ত সতর্কবার্তার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সাধারণত খোলা মাঠে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত নিচু স্থানে অবস্থান নেওয়া বা বড় গাছের নিচে না দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
আজকের এই প্রাণহানি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, বজ্রপাত এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং প্রাণহানি কমাতে উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। নিহতদের পরিবারকে সরকারি সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনগুলো জানিয়েছে।

