নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে গলাকেটে হত্যার রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল পৈত্রিক জমির ভাগ-বাটোয়ারা আর উত্তরাধিকার শেষ করে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা। এই ঘটনায় আপন দুলাভাই, ভাগ্নেসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার বিকেলে নওগাঁ জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ দেন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—নিহত হাবিবুর রহমানের আপন দুলাভাই শহিদুল ইসলাম, ভাগ্নে সবুজ রানা এবং শহিদুলের ছেলে শাহিন মন্ডল। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর তারা পালিয়ে গেলেও নিবিড় তদন্তের মুখে ধরা দিতে বাধ্য হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা হাঁসুয়া ও ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন ইতিমধ্যেই পুলিশের কাছে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ সুপার জানান, বাহাদুরপুর গ্রামের বৃদ্ধ নমির উদ্দিনের পাঁচ মেয়ে এবং একমাত্র ছেলে ছিল হাবিবুর রহমান। নমির উদ্দিন তার ১৩ বিঘা জমি একমাত্র ছেলের নামে লিখে দিয়েছিলেন এবং পাঁচ মেয়ের প্রত্যেককে মাত্র ১০ কাঠা করে জমি দেন। এই বৈষম্য থেকেই মেয়ে ও জামাইদের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমা ছিল। তারা মনে করত, যদি হাবিবুর ও তার উত্তরসূরিদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই বোনেরা পুরো জমির মালিক হবে।
হত্যাকাণ্ডের দিন অর্থাৎ ২০ এপ্রিল রাতে ভাগ্নে সবুজ রানা তার নানা নমির উদ্দিন এবং মামা হাবিবুরের সঙ্গে একই ঘরে বসে রাতের খাবার খান। কিন্তু তার মনে তখন ছিল খুনের নেশা। খাবার খেয়ে তিনি বাইরে গিয়ে অপেক্ষারত দুলাভাই শহিদুল ও শাহিনের সঙ্গে চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন। সিদ্ধান্ত হয়, গভীর রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, তখন হাবিবুর ও তার পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে। এমনকি বৃদ্ধ নমির উদ্দিন যাতে ঘর থেকে বের হতে না পারেন, সেজন্য বাইরে থেকে তার দরজায় ছিটকানি লাগিয়ে দেওয়া হয়।
রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে ঘাতকরা ঘরে প্রবেশ করে। শাহিন মন্ডল প্রথমে বড় ধারালো হাঁসুয়া দিয়ে মামা হাবিবুরকে জবাই করে। এরপর হাবিবুরের স্ত্রী পপি সুলতানা প্রকৃতির ডাকে ঘর থেকে বের হলে ঘাতক সবুজ খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। সবশেষে কোনো সাক্ষী না রাখতে ৯ বছর বয়সী পারভেজ এবং ৩ বছরের শিশু সাদিয়াকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ঘাতকদের মূল লক্ষ্য ছিল বংশের কোনো বাতি রাখা যাবে না, যাতে জমির উত্তরাধিকার নিয়ে কেউ দাবি করতে না পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সবুজকে তার নানা নমির উদ্দিন সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। সবুজ ভেবেছিল, মামার পরিবারকে শেষ করে দিলে উত্তরাধিকার সূত্রে সেই জমির বড় অংশ তার হাতে আসবে। এই লোভই তাকে ঘাতকে পরিণত করে। পুলিশ ইতিমধ্যেই শাহিনের বাড়ির পাশ থেকে এবং একটি পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক সবুজের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাহাদুরপুর গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহত পপি সুলতানার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন বাদী হয়ে নিয়ামতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একটি সুন্দর সাজানো সংসারকে স্রেফ কয়েক বিঘা জমির লোভে এভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনায় নওগাঁজুড়ে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ সুপার আশ্বস্ত করেছেন যে, কোনো নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হচ্ছে। ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখতে এখন আদালতের দিকে তাকিয়ে নিহতের স্বজন ও গ্রামবাসী।

