মাঝপদ্মার শান্ত জলরাশি হঠাৎ করেই রণক্ষেত্রে পরিণত হলো মধ্যরাতের অন্ধকারে। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীতে নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় একদল অজ্ঞাত সন্ত্রাসীর অতর্কিত হামলার শিকার হয়েছেন নৌ-পুলিশের সদস্যরা। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া জেলার হরিপুর সীমানায় ঘটা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লক্ষীকুণ্ডা নৌ-ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) অন্তত পাঁচজন সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় রাত আনুমানিক ১টা ১০ মিনিট নাগাদ। পুলিশ জানিয়েছে, লক্ষীকুণ্ডা নৌ-ফাঁড়ির একটি দল যখন সরকারি দায়িত্ব পালনে স্পিডবোটে টহল দিচ্ছিল, তখন অন্ধকার চরাঞ্চল থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। প্রাণ বাঁচাতে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চলা এই রুদ্ধশ্বাস গোলাগুলির এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পিছু হটলেও ততক্ষণে রক্তাক্ত হন টহল দলের পাঁচ সদস্য।
আহতরা হলেন—লক্ষীকুণ্ডা নৌ-ফাঁড়ির ইনচার্জ খন্দকার শফিকুল ইসলাম এবং কনস্টেবল ইনামুল হক, শাহিনুর হক, নাজমুল হাসান ও মানিক মিয়া। গুলির শব্দ শুনে আশেপাশে থাকা অন্যান্য টহল দল ও স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত তাদের উদ্ধার করা হয়। গভীর রাতেই তাদের পাবনা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির আঘাত রয়েছে।
আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকি চারজন পাবনা সদর হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালের সামনে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা।
পদ্মা নদীর ওই এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে বেশ দুর্গম এবং একাধিক জেলার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, নদীপথে অবৈধ মাদক পাচার বা চোরাচালানে বাধা পাওয়ায় কোনো সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মশিউর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “নিয়মিত টহলের সময় আমাদের সদস্যদের ওপর কাপুরুষোচিত এই হামলা চালানো হয়েছে। অপরাধীরা চরাঞ্চলের অন্ধকারের সুযোগ নিয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং পুরো এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয়েছে।”
এদিকে, হামলার পর থেকেই পদ্মা নদীর সংশ্লিষ্ট চরাঞ্চল ও কুষ্টিয়ার হরিপুর এলাকায় পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করতে পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে সম্ভাব্য সকল চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
নদীবেষ্টিত এই জনপদে এমন দুঃসাহসিক হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে নৌ-পথে অপরাধ দমনে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণেই এমন হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ বিভাগ। আপাতত গুলিবিদ্ধ সদস্যদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

