রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অপরিসীম, আর এর অভাবে সাধারণ মানুষকে কতটা ভোগান্তি পোহাতে হয়—সেই কঠোর সত্যটিই মনে করিয়ে দিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) তিন দিনের সরকারি সফরে নিজ জেলা ভোলায় পৌঁছে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে স্পিকার বলেন, “প্রফেসর ইউনূস বিশ্ববিখ্যাত একজন মানুষ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আর বিশ্বজুড়ে নাম কামানো এক কথা নয়। বিগত সরকার মূলত অভিজ্ঞতার অভাবেই জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।” তিনি উদাহরণ হিসেবে বর্তমানের টিকা সংকট ও অর্থনীতির নিম্নমুখী সূচকের কথা উল্লেখ করে বলেন, “অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র গেলে রাষ্ট্রের সূচকগুলো ভেঙে পড়ে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।”
তবে ওই সরকারকে একটি বিষয়ে কৃতিত্ব দিতেও কার্পণ্য করেননি তিনি। মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, “তারা হয়তো প্রশাসনে অভিজ্ঞ ছিল না, কিন্তু সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। দেশ এখন আবার গণতন্ত্রের ট্র্যাকে ফিরে এসেছে এবং আমি বিশ্বাস করি, এই গণতান্ত্রিক ধারাতেই জাতি সমৃদ্ধ হবে।”
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্ক সম্পর্কে স্পিকার তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে কিছু আলোচনা আছে। তবে মনে রাখতে হবে, মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি মিলে রাষ্ট্রের সংবিধান বদলে দিতে পারেন না। সংবিধান পরিবর্তনের একক অধিকার কেবল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। কিছু উদ্ভট নিয়ম হয়তো রেখে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের ম্যান্ডেটই চূড়ান্ত।”
তিনি আরও জানান, প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে জুলাই সনদের কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকলেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় কোনো সংঘাতের সুযোগ নেই। রাজনৈতিক কৌশলের খাতিরে কিছু ছোটখাটো মতভেদ থাকলেও দ্রুতই একটি জাতীয় সমঝোতা তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করে স্পিকার বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনে আমি যখন আমার নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলাম, তখন ১৬ দিন নিজের বাড়িতেই অবরুদ্ধ ছিলাম। পুলিশ আমাকে বের হতে দেয়নি। এভাবেই বছরের পর বছর এ দেশে গণতন্ত্রকে গলা টিপে ধরা হয়েছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, “আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মতো তরুণদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে মাফিয়া নেত্রী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আজ যে গণতন্ত্র আমরা ভোগ করছি, তা লাখো তরুণের রক্তে ভেজা।”
বিকেল সোয়া ৩টার দিকে ভোলা সার্কিট হাউসে পৌঁছালে স্পিকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সফরের বাকি দিনগুলোতে তিনি নিজ এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে স্পিকার দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, শাসনব্যবস্থায় দক্ষ জনবলের অভাব থাকলে নীতি প্রণয়নে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা কাটিয়ে উঠতে নির্বাচিত সংসদই হবে শ্রেষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম।

