বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর বর্তমান ইউনিফর্ম বা পোশাক নিয়ে বাহিনীর ভেতরেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। মন্ত্রী জানান, বাহিনীর সদস্যদের পছন্দ এবং জনআকাঙ্ক্ষার কথা বিবেচনা করে পুলিশের ঐতিহ্যমণ্ডিত পুরোনো কোনো একটি পোশাকে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান যে পোশাক, তাতে পুলিশ বাহিনী সন্তুষ্ট নয়। আমরা চাই আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এমন একটি পোশাক, যা বাহিনীর মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। এ বিষয়ে খুব দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” তার এই মন্তব্য মূলত পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে নতুন অফিসাররা
শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশ এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক নতুন এক বাস্তবতায় ৪৩তম বিসিএসের কর্মকর্তারা তাদের কর্মজীবনে পদার্পণ করছেন। এই রূপান্তরকালে নিজেদের দক্ষ ও উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, জনগণের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে তাদের মূল মন্ত্র।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বাহিনীও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের যে কাঠামো ছিল, তা ভেঙে পড়েছিল। সেই ভঙ্গুর দশা কাটিয়ে পুলিশ এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, পুলিশ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়। বরং পুলিশ হবে জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু।”
প্রশিক্ষণ ও সমাপনী কুচকাওয়াজের খুঁটিনাটি
২০২৫ সালের ১ মার্চ শুরু হওয়া এই নিবিড় মৌলিক প্রশিক্ষণে মোট ৮০ জন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ এক বছরের প্রশিক্ষণ শেষে আজ ৭২ জন কর্মকর্তা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে সমাপনী কুচকাওয়াজে অংশ নেন। এদের মধ্যে ৬৬ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী ক্যাডার রয়েছেন।
অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যসহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নবীন কর্মকর্তাদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কর্মকর্তাদের সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জনগণের স্বস্তি ও আইন-শৃঙ্খলা
সরকারের বর্তমান অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরানো এবং দেশে শান্তি রক্ষা করাই এখন মূল লক্ষ্য। পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে জনবান্ধব হওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, অপরাধ দমনে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, তবে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রতি জনগণের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে নতুন কর্মকর্তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ফেরার এই সিদ্ধান্ত বাহিনীর মনোবল চাঙা করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের একটি নতুন ও ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।

