কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের স্বজনদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ মেটাতে গিয়ে নজিরবিহীন হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাতে কুষ্টিয়া-৪ আসনের এমপি মোঃ আফজাল হোসেনের পারিবারিক সদস্যদের বাগবিতণ্ডা ও সংঘর্ষ থামাতে গেলে ওসির ব্যবহৃত সরকারি পিকআপ ভ্যানে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালানো হয়। রাত ৮টার দিকে কুমারখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এলংগীপাড়া এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মোঃ আফজাল হোসেনের দুই চাচাতো ভাই—আনোয়ার ও শিপলুর মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ চলছিল। বৃহস্পতিবার রাতে এই বিরোধ চরম আকার ধারণ করলে এমপির উপস্থিতিতেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংসদ সদস্য নিজেই থানা পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে দ্রুত এলংগীপাড়া পৌঁছান। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসামাত্রই উত্তেজিত জনতা এবং এমপির স্বজনদের অনুসারীরা রেললাইনের পাথর ও ইট কুড়িয়ে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি নিক্ষেপ শুরু করে। পাথরের আঘাতে ওসির ব্যবহৃত জিপ গাড়ির সামনের কাঁচ একাধিক স্থানে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তবে সৌভাগ্যবশত পুলিশের কোনো সদস্য এই ঘটনায় গুরুতর আহত হননি।
হামলার ঘটনার পর কুমারখালী থানা চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ওসির ব্যবহৃত সাদা রঙের পিকআপ ভ্যানটির সামনের গ্লাসে ভাঙচুরের গভীর ক্ষত। পুলিশের গাড়িতে এমন দুঃসাহসিক হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো জেলায় তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনার বিষয়ে সংসদ সদস্য মোঃ আফজাল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে এমপির ভাতিজা অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম দাবি করেছেন, ঘটনার সময় এমপি বাড়িতে ছিলেন না। তিনি বলেন, “পারিবারিক ঝগড়া মেটাতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ আসার পর কারা এই ঢিল ছুড়েছে তা বলা মুশকিল। আমরা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করছি।” যদিও স্থানীয়রা বলছেন, এমপির উপস্থিতিতেই তার স্বজনরা বেপরোয়া হয়ে পুলিশের ওপর এই আক্রমণ চালায়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন জানান, “এমপি সাহেবের ফোন পেয়েই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই দুই পক্ষের লোকজন রেললাইনের পাথর দিয়ে আমাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে সরকারি গাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।” তিনি আরও জানান, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় কোনো আপস নেই এবং দোষীদের ধরতে রাতেই এলাকায় বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “পুলিশের গাড়িতে হামলা মানেই রাষ্ট্রের ওপর আঘাত। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং যারাই এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জড়িত থাকুক, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
এলংগীপাড়া এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে পুনরায় কোনো সংঘাতের সৃষ্টি না হয়। রাজনৈতিক নেতার স্বজনদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

