ক্যালেন্ডারের পাতায় উৎসবের হাতছানি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাত দিনের টানা ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছিলেন শরিফুল ইসলাম। সাথে ছিল সাজানো সংসার— স্ত্রী আর দুই সন্তান। কিন্তু এক নিমেষের এক প্রচণ্ড ধাক্কায় সব ওলটপালট হয়ে গেল। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাওয়ার পথে প্রাণ হারালেন শরিফুলসহ তার পরিবারের তিন সদস্য। মঙ্গলবার সকালে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
ঈদের এই আবহে যেখানে সবার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক থাকার কথা, সেখানে শরিফুলের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পাটগ্রামের মির্জারকোট মডেল মসজিদ এলাকায় বেপরোয়া গতির একটি ট্রাক কেড়ে নিল একটি সাজানো পরিবারের সব স্বপ্ন।
এক নিমেষেই সব শেষ
নিহত শরিফুল ইসলামের (৩৫) বাড়ি দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর উপজেলার আলীহাট ইউনিয়নের মনসাপুর গ্রামে। তিনি পাটগ্রামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) কর্মরত ছিলেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে ঈদের ছুটি শুরু হতেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মির্জারকোট এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া ট্রাক তাদের মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় শরিফুল ইসলাম, তার স্ত্রী এবং শিশুপুত্রের। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের একমাত্র মেয়েকে উদ্ধার করে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সে সেখানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।
শোকস্তব্ধ পাটগ্রাম ও নিজ গ্রাম
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। ঘাতক ট্রাকটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় এমন দুর্ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছি।”
শরিফুলের কর্মস্থল এবং তার গ্রামের বাড়িতে এই খবর পৌঁছালে শোকের মায়া নেমে আসে। সহকর্মীরা জানান, শরিফুল খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। ছুটির আগে সহকর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেই তিনি বের হয়েছিলেন, কিন্তু সেই পথ যে শেষ পর্যন্ত চিতার দিকে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
ঈদযাত্রায় সতর্কতার অভাব ও প্রশ্ন
প্রতিবছর ঈদের সময় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে গাড়ির চাপ বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দুর্ঘটনা। বিশেষ করে মোটরসাইকেলে সপরিবারে যাতায়াত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আবারও এই ট্র্যাজেডি মনে করিয়ে দিল। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ঈদের সময় ট্রাক ও ভারী যানবাহনগুলো বেপরোয়া গতিতে চলে, যা এই ধরনের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
সড়কে পুলিশের তৎপরতা বাড়লেও চালকদের অসতর্কতা আর নিয়ম ভাঙার প্রবণতা থামানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত গতিতে চালানোর মানসিকতা বারবার কেড়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। শরিফুলের মতো আর কারো ঈদ যেন এভাবে সড়কের রক্তে রঞ্জিত না হয়, এমনটাই দাবি সাধারণ মানুষের।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত শিশুটির অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে এই শিশুটি এখন হাসপাতালের বিছানায় নিঃসঙ্গ লড়াই করছে।

