ইট-কাঠের খাঁচা থেকে মুক্তি মিলেছে। শুরু হয়েছে প্রিয়জনের টানে শিকড়ে ফেরার চিরাচরিত উৎসব। মঙ্গলবার সকাল থেকেই দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঈদুল ফিতরের ঘরমুখো মানুষের পদচারণা বাড়তে শুরু করেছে। তবে প্রতিবছরের সেই চেনা ভোগান্তি, মাইলের পর মাইল যানজট আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার চিত্র এবার উধাও। মহাসড়কের পিচঢালা পথে চাকা ঘুরছে আপন গতিতে, যা যাত্রীদের মনে এনে দিয়েছে বাড়তি স্বস্তি।
সাত দিনের দীর্ঘ সরকারি ছুটির প্রথম দিন আজ। সকাল থেকেই রাজধানী থেকে বের হওয়া বাসগুলোর চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে শুরু করে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কের কোথাও বড় কোনো প্রতিবন্ধকতার খবর পাওয়া যায়নি। যাত্রীরা বলছেন, ঢাকা শহর ত্যাগের সময় সামান্য ধীরগতি থাকলেও মহাসড়কে ওঠার পর তারা এক প্রকার ‘ফ্লাইং মুডে’ গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন।
যাত্রীদের চোখে এক পশলা স্বস্তি
ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ফেরা এশিয়া এয়ারকন বাসের যাত্রী আসাদুল ইসলাম যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে এত দ্রুত বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম অন্তত পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু ঢাকার জটটুকু পার হওয়ার পর পুরো রাস্তা একদম পরিষ্কার। আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই কুমিল্লায় নেমে গেছি। এমন ঈদযাত্রা আগে কখনো দেখিনি।”
বিপরীত দিক থেকেও চিত্রটা একই রকম। চট্টগ্রাম থেকে তিশা প্লাস বাসে আসা কাইমুল হক জানান, মহাসড়কে কোথাও গাড়ির জটলা বা জ্যামের ছিটেফোঁটাও নেই। চালকরাও বেশ আয়েসে গাড়ি চালাচ্ছেন। সময়ের অপচয় না হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের ফুরফুরে মেজাজ লক্ষ্য করা গেছে।
নেপথ্যে প্রশাসনের নিশ্ছিদ্র প্রস্তুতি
এই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির পেছনে কাজ করছে প্রশাসনের আগাম ও সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, এবার ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে তারা আগে থেকেই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। মহাসড়কের ২৭টি পয়েন্টকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। যাতে কোনো ছোট দুর্ঘটনা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি না হয়।
কুমিল্লা রিজিয়নের হাইওয়ে পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম জানান, মহাসড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দুই সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আজ ঈদযাত্রার প্রথম দিনে আমরা এখনো কোনো ভোগান্তির অভিযোগ পাইনি। পুরো মহাসড়ক আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ড্রোন এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমেও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
শঙ্কা ও প্রত্যাশা
বিকেলের দিকে গাড়ির চাপ আরও কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও হাইওয়ে পুলিশের দাবি, তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। রেকার এবং ভ্রাম্যমাণ টিমগুলো কৌশলগত স্থানে অবস্থান করছে। তবে চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানোর এবং ওভারটেকিং না করার অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মহাসড়কের এই স্বস্তি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দু-এক দিনের চাপের ওপর। তবে প্রথম দিনের এই ঝকঝকে চিত্র সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়াহুড়োর মাঝেও একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ঈদযাত্রা এখন সবার কাম্য।

