দিনাজপুরের কাহারোলে এক বিশাল জনসমাবেশে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও কৃষির আধুনিকায়নের নতুন রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (১৬ মার্চ) বিকেলে উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া এলাকায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল পুনঃখনন কর্মসূচির শুভ উদ্বোধনকালে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোই বিএনপির রাজনীতির প্রধান দর্শন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জনগণের আয় বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। আজ যে ব্যক্তি মাসে ৫ হাজার টাকা উপার্জন করছেন, আমাদের নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী দুই-চার বছরের মধ্যে সেই আয় যেন ১০ হাজারে পৌঁছায়, আমরা সেই চেষ্টাই করছি। মানুষের পকেটে টাকা বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই শহীদ জিয়ার আদর্শ আর বেগম জিয়ার রাজনীতির মূল ভিত্তি।”
বলরামপুর শাহাপাড়া খালের এই পুনঃখনন প্রকল্পটিকে কেবল একটি উন্নয়ন কাজ হিসেবে নয়, বরং ওই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি খনন সম্পন্ন হলে ৩১ হাজার কৃষক সরাসরি সেচ সুবিধা পাবেন। এর ফলে প্রায় ১২০০ হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে এবং ওই এলাকায় বার্ষিক ফসল উৎপাদন প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে দেশের সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থার সংকট ও সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের সিংহভাগই গ্রামে বাস করেন এবং তাদের জীবন কৃষিনির্ভর। তাই কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়েই নির্বাচনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সারা দেশে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলো উদ্ধার করা আমাদের অগ্রাধিকার। আগামী পাঁচ বছরে আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। এতে বর্ষার পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের কাজে লাগবে। পাশাপাশি এটি উজান থেকে আসা আকস্মিক বন্যা ও ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।”
পরিবেশ রক্ষায় সরকারের দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি জানান, শুধু খাল খননই শেষ কথা নয়; খালের দুই পাশে প্রায় সাত হাজার ফলজ ও বনজ গাছ লাগানো হবে। এছাড়া খালের পাড় দিয়ে স্থানীয় মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তার ব্যবস্থাও করা হবে। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি উপরিভাগের পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দেন।
প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ নিয়ে অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩৭ হাজার মা-বোনের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আগামী মাস থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’-এর পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে, যার মাধ্যমে সরকারি সব সুবিধা সরাসরি প্রকৃত কৃষকদের হাতে পৌঁছাবে।
সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি যা কেবল ক্ষমতায় থাকার জন্য নয়, বরং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কাজ করে। মানুষের কল্যাণই দলের একমাত্র এজেন্ডা। বর্তমান সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ জনগণের উপকারের কথা মাথায় রেখে গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে এই জনসভায় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেলুন উড়িয়ে ও প্রতিকী খনন কাজের মাধ্যমে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। এসময় কাহারোল ও বীরগঞ্জের হাজার হাজার মানুষ স্লোগানে স্লোগানে এলাকা মুখরিত করে তোলেন। দীর্ঘ খরা ও সেচ সংকটে ভোগা উত্তরবঙ্গের কৃষকদের জন্য এই প্রকল্প নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম, সাদিক রিয়াজ চৌধুরী ও সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমসহ জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই উপস্থিতি প্রকল্পটির গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

