বরিশালের বাবুগঞ্জে এক বিভীষিকাময় ঘটনার সাক্ষী হলো স্থানীয়রা। মাত্র ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার পর সে রাজি না হওয়ায় তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানল ছোট্ট শিশু রাইসা আক্তার। তবে চলে যাওয়ার আগে সে রেখে গেছে এক ভয়ঙ্কর সত্যের জবানবন্দি, যা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল।
রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের দক্ষিণ রাকুদিয়া এলাকায় এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটে। দগ্ধ রাইসাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা নেওয়া হয়। ওইদিন রাত ১০টার দিকে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু নিশ্চিত করে পরিবার।
নিহত রাইসা আক্তার ওই এলাকার দিনমজুর নজরুল হাওলাদারের মেয়ে। অভিযুক্ত কিশোরের নাম সিফাত শিকদার (১৫), যে একই এলাকার জালাল শিকদারের ছেলে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ দিন ধরেই সিফাত শিশু রাইসাকে পথেঘাটে উত্ত্যক্ত করত এবং বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দিয়ে আসছিল।
রোববার দুপুরে রাইসা যখন বাড়ির পাশে একা ছিল, তখন সিফাত তার পথরোধ করে। পরিবারের দাবি ও রাইসার মৃত্যুর আগের বক্তব্য অনুযায়ী, সিফাত তাকে আবারও কুপ্রস্তাব দেয়। রাইসা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলে ক্ষিপ্ত হয়ে সিফাত তার শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা যখন শিশুটির শরীর গ্রাস করছিল, তখন তার চিৎকার শুনে প্রতিবেশী তসলিম ছুটে আসেন।
তসলিমের চিৎকারে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে রাইসাকে উদ্ধার করে দ্রুত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির শরীরের বড় একটি অংশ পুড়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। বিকেলেই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকার পথে রওনা করানো হয়।
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে রাইসা যে কথাগুলো বলেছে, তা শুনলে যে কারোরই গা শিউরে উঠবে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে শিশুটি বলে, ‘আমাকে খারাপ জিনিস কইছে, আমি রাজি হইনি তাই সিফাত আমার গায়ে আগুন দিছে।’ জীবনের শেষ মুহূর্তে দেওয়া এই স্বীকারোক্তির ভিডিও এখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তির কিছু সময় পরই রাইসা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। একটি শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এলাকার সাধারণ মানুষ ও স্বজনরা এই ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সিফাত ও তার পরিবারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন।
বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. এহতেশামুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তিনি বলেন, “অগ্নিদগ্ধ হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, অভিযোগ পেলেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বখাটে কিশোরদের প্রশ্রয় দেওয়ার ফলেই আজ রাইসার মতো শিশুদের প্রাণ দিতে হচ্ছে। দিনমজুর বাবার অভাবের সংসারে রাইসা ছিল চোখের মণি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন দিশেহারা। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা নজরুল হাওলাদার শুধু বিচার চেয়েছেন, যাতে আর কোনো বাবাকে এভাবে সন্তান হারাতে না হয়।
বর্তমানে রাইসার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সিফাত ও তার পরিবারের সদস্যরা পলাতক বলে জানা গেছে। পুলিশ তাদের খুঁজে বের করতে অভিযান চালাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একটি ১০ বছরের শিশুকে যেভাবে লালসার শিকার হয়ে পুড়তে হলো, তা মানবিক সমাজ ব্যবস্থাকে বড় এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বরিশালের এই ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। রাইসার সেই শেষ আকুতি যেন বিচারহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, এটাই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র দাবি। বিচারের আশায় এখন পথ চেয়ে আছে দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের মানুষ।

