পটুয়াখালীর শান্ত লাউকাঠি নদীর পাড়ে এখন শুধুই কান্নার রোল। যে বাড়িতে ঈদের আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন চলছে শোকের মাতম। ঢাকা থেকে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসে প্রাণ হারালো ১০ বছর বয়সী শিশু হুসাইন আদনান। তবে এই মৃত্যুকে কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ তার পরিবার। তাদের অভিযোগ, এটি কোনো সাধারণ বিচ্যুতি নয়, বরং আদনানকে পরিকল্পিতভাবে বা অবহেলায় ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৫ মার্চ) বিকেলে পটুয়াখালী শহরের সংলগ্ন মাঝগ্রাম এলাকার লাউকাঠি নদী থেকে আদনানের নিথর দেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। আদনান পটুয়াখালী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মামুন তালুকদার ও উম্মে হাবিবা দম্পতির বড় ছেলে। গত দীর্ঘ সময় ধরে তারা ঢাকার মিরপুর-১ এলাকায় বসবাস করছিলেন। সেখানে একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে পড়াশোনা করত আদনান।
দীর্ঘদিন পর শেকড়ের টানে গ্রামে ফেরা আদনানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, রোববার দুপুরে আড়াইটার দিকে সমবয়সী কয়েকজনের সঙ্গে বাড়ির সামনে নোঙর করা একটি ট্রলারে উঠেছিল আদনান। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ট্রলার থেকে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় স্বজনদের আহাজারি আর ফায়ার সার্ভিসের রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি।
প্রায় দেড় ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর বিকেল ৪টার দিকে নদী থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা যখন পানি থেকে আদনানকে উপরে তুলছিলেন, তখন নদীর তীরে জমা হওয়া শত শত মানুষের চোখে ছিল জল। আদনানের মা উম্মে হাবিবার বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল লাউকাঠির বাতাস। তার দাবি ঘিরে এখন এলাকায় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
বিলাপ করতে করতে উম্মে হাবিবা বলেন, “আমরা মাত্র কাল সকালে ঢাকা থেকে আসলাম। বড় আশা করে ছেলেটাকে নিয়ে বাড়ি আসছি। আমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে ও ঘুরতে গেছিল। ট্রলারের লোকজন আমার কলিজাটারে ধাক্কা দিয়া পানিতে ফালাই দিছে। ও তো সাঁতার জানত না! ধাক্কা দিয়া ওরে ফালায়া দিয়া ওরা ট্রলার নিয়া চইলা গেছে।”
আদনানের খালা রূপার কণ্ঠেও ঝরছিল ক্ষোভ আর বিচার চাওয়ার আকুতি। তিনি বলেন, “ছেলেটা ঈদ করতে এল, কিন্তু ওর আর ঈদ কাটানো হলো না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা ওকে ধাক্কা মেরেছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।” এই অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন এটি স্রেফ দুর্ঘটনা, আবার কেউ ট্রলারের লোকজনের রহস্যজনক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
পটুয়াখালী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের (পটুয়াখালী নদী) স্টেশন অফিসার মো. রেজওয়ান গণমাধ্যমকে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই তাদের একটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তিনি বলেন, “নদী উত্তাল না থাকলেও শিশুটি যেখানে পড়েছিল সেখানে গভীরতা ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আমরা মরদেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হই। নিয়ম অনুযায়ী এরপর আমরা মরদেহটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি।”
তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আদনানের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি। বর্তমানে মরদেহটি পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুরো ঘটনা নিয়ে পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার কল করা সত্ত্বেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের আপডেট নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি করেছে।
পটুয়াখালীর এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে ঈদ মৌসুমে নৌ-পথে যাতায়াত এবং নদী পাড়ে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা জরুরি। বিশেষ করে যারা শহর থেকে গ্রামে ফেরেন, তাদের জন্য গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেক সময় অপরিচিত ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আদনানের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ঈদ মাটি করেনি, বরং পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলে দিয়েছে।
আদনানের প্রতিবেশীরা জানান, ছেলেটি খুব শান্ত প্রকৃতির ছিল। মাদ্রাসায় পড়ার কারণে তার চালচলন ছিল অত্যন্ত মার্জিত। তার এই অকাল মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ আক্ষেপ করে বলছিলেন, “মাটির টানে এল, সেই মাটিই শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হলো, কিন্তু পানি তাকে কেন কেড়ে নিল তা বিধাতাই জানেন।”
এখন জনমনে বড় প্রশ্ন হলো, মা হাবিবার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? যদি সত্যিই আদনানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়, তবে সেই ট্রলারটি কার ছিল এবং সেখানে কারা উপস্থিত ছিল? স্থানীয়রা দাবি করছেন, নদী তীরের সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। পুলিশি তদন্তই পারে এই শোকাতুর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের বিচার নিশ্চিত করতে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মাঝগ্রামের লাউকাঠি নদীর তীরে জনসমাগম কমে গেলেও বাতাস এখনো আদনানের মায়ের হাহাকারে পূর্ণ। ঈদের নতুন পোশাক হয়তো আলমারিতেই থেকে যাবে, কিন্তু সেই পোশাক পরার জন্য আদনান আর কোনোদিন ফিরবে না। একটি দুর্ঘটনা বা একটি অপরাধ—যে নামেই একে ডাকা হোক না কেন, ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
নিরাপদ নৌ-ভ্রমণ এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ নজরদারির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আবারও নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। বিশেষ করে পটুয়াখালীর মতো নদীবহুল জেলায় প্রতিবছরই এমন অনেক প্রাণ ঝরে যায় অসতর্কতায়। আদনানের এই বিয়োগান্তক ঘটনা যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না করে, এটাই এখন সকলের প্রার্থনা।

