বরিশালের প্রধান সরকারি চিকিৎসালয় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবামেক) হাসপাতালে সেবিকাদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের কারণে দুই নারী রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রোববার সকালে হাসপাতালের চতুর্থ তলার নাক-কান-গলা বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটে। সুস্থ অবস্থায় অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা দুই রোগীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা হাসপাতাল জুড়ে উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহতরা হলেন—বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার সারসী গ্রামের মৃত বাবুল হাওলাদারের স্ত্রী হেলেনা বেগম (৪৮) এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর এলাকার মন্নান তালুকদারের স্ত্রী শেফালি বেগম (৬০)। স্বজনদের দাবি, নার্সদের গাফিলতিতেই তাদের প্রিয়জনদের অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, থাইরয়েড ও মুখের টিউমার জনিত সমস্যার চিকিৎসার জন্য রমজানের শুরুতেই তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। রোববার সকালে তাদের অস্ত্রোপচার করার কথা ছিল। কিন্তু থিয়েটারে নেওয়ার আগেই ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সেবিকারা তাদের শরীরে কয়েকটি ইনজেকশন প্রয়োগ করেন। ওষুধ দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুজনের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
নিহত হেলেনা বেগমের ছেলে ইব্রাহিম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার মা দিব্যি সুস্থ ছিল। নার্স এসে ইনজেকশন দেওয়ার পরই মা ছটফট করতে করতে শেষ হয়ে গেল।” অন্যদিকে, শেফালি বেগমের মেয়ে খাদিজা বেগম এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে বলেন, নার্সদের বারবার অনুনয় করা হলেও তারা শুরুতে বিষয়টিকে পাত্তাই দেননি। চোখের সামনে মায়ের এমন মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
ঘটনার তদন্তে নেমে ভয়ংকর তথ্য দিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন। শেবামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর জানিয়েছেন, এটি স্পষ্টতই পেশাগত অবহেলা। সাধারণত অপারেশনের আগের কিছু বিশেষ অ্যানেসথেটিক ওষুধ অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু সেবিকারা নিয়ম ভেঙে সেই ওষুধগুলো সাধারণ ওয়ার্ডেই পুশ করে দেন। ওয়ার্ডে জীবনরক্ষাকারী জরুরি যন্ত্রপাতির অভাব থাকায় রোগীদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্ত সেবিকা হেলেন অধিকারী ও মলিনা হালদার একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করলেও ভুল স্বীকার করেছেন। মলিনা হালদার দাবি করেছেন, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ীই তিনি ইনজেকশন দিয়েছেন। তবে ২৬ বছরের চাকরি জীবনে এমন পরিস্থিতি কেন হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না বলে জানান। নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক খাদিজা বেগমও ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
হাসপাতাল পরিচালক এই ঘটনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। স্বজনরা যদি আইনি পথে হাঁটেন, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সব ধরনের সহায়তা দেবে। তবে শোকাতুর পরিবারগুলো দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের হয়রানি এড়িয়ে কেবল বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা করছে।
বরিশালের এই ঘটনা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নার্সদের প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একটি সাধারণ ভুল যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, শেবামেক হাসপাতালের এই ট্র্যাজেডি তার দগদগে প্রমাণ।

