বসন্তের তপ্ত দুপুরের মাঝেও যশোরের সতীঘাটা এলাকায় বইছে এক শীতল প্রশান্তির হাওয়া। তবে এ হাওয়া প্রকৃতির নয়, বরং আধ্যাত্মিকতার। সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আশরাফুল মাদারিস মসজিদে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ব্যাকুলতায় এখানে একসঙ্গে ইতেকাফে বসেছেন দেশি-বিদেশি ১ হাজার ৬৪৪ জন ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। বিশাল এই জমায়েত পুরো এলাকায় এক অনন্য ধর্মীয় আবহ তৈরি করেছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, রমজানের ২০তম তারিখের সূর্যাস্তের আগে থেকেই মুসল্লিরা ইতেকাফে শামিল হয়েছেন। এবারের আয়োজনে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ৮০ জন বিদেশি মেহমান। ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, পানামা, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের (লন্ডন) নাগরিকরা এই অজপাড়াগাঁয়ের মাদ্রাসায় এসে ইবাদতে মগ্ন হয়েছেন।
মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা হাসান ইমাম জানান, বিদেশি এই মেহমানরা রমজানের শুরু থেকেই মাদ্রাসায় অবস্থান করছেন। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ। সব মিলিয়ে ১৬শ ছাড়ানো এই বিশাল বাহিনীর আবাসন নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। চারতলা বিশিষ্ট মূল মসজিদ ভবনটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত মসজিদের ছাদে ত্রিপল টাঙিয়ে বিশেষ থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোদ কিংবা বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে খোলা ছাদের নিচেই ইবাদতে মশগুল রয়েছেন মুসল্লিরা।
তবে এবারের আয়োজনে একটি বিষণ্ন সুরও বেজেছে। মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা নাসিরুল্লাহ জানান, তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৬০০ মুসল্লিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিপর্যয় এবং ভিসা জটিলতায় অধিকাংশ আমন্ত্রিত মেহমান আসতে পারেননি। যারা পৌঁছাতে পেরেছেন, তারা যুদ্ধের দামামা শুরুর আগেই বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন।
বিশাল এই আয়োজনের ব্যয়ভার নিয়ে মাওলানা নাসিরুল্লাহ বলেন, “যশোরের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা এবং ইতেকাফে বসা মুসল্লিদের নিজস্ব অর্থায়নেই সেহরি ও ইফতারের রাজকীয় আয়োজন চলছে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ভ্রাতৃত্বের এক বিশাল মিলনমেলা।”
স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবছর এই সময়ে আমাদের সতীঘাটা এলাকাটি যেন এক টুকরো পুণ্যভূমিতে পরিণত হয়। বিদেশ থেকে মানুষ এখানে ইবাদত করতে আসে, এটা আমাদের এলাকার জন্য বড় রহমত।” উল্লেখ্য, আশরাফুল মাদারিস মাদ্রাসায় বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ছাত্র দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করছে, যার মধ্যে অর্ধশত এতিম শিশু রয়েছে।
আগামী পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন স্থানীয় সতীঘাটা ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায়ের পর দেশি-বিদেশি এই মুসল্লিরা একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেবেন। ততদিন পর্যন্ত জিকির, তিলাওয়াত আর মোনাজাতে মুখরিত থাকবে সতীঘাটার আকাশ-বাতাস।

