রাজধানীর মিরপুরে একটি বাণিজ্যিক ভবনে লাগা ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিল নীলফামারীর সৈয়দপুরের এক কৃতি সন্তানের প্রাণ। নিহত আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সৈনিক পদে কর্মরত ছিলেন। সোমবার দুপুরে মিরপুর-২ এলাকার ওই ভবনে আটকা পড়ে মারাত্মক দগ্ধ হওয়ার পর রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার নিচু কলোনী বিমানবন্দর পূর্বপাড়া এলাকায় অনন্যার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পাড়া-প্রতিবেশী আর স্বজনদের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। আব্দুল হান্নানের বড় মেয়ে অনন্যা ছিলেন পরিবারের আশার প্রদীপ। মাত্র চার বছর আগে বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়ে অভাবী সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু একটি অগ্নিকাণ্ড নিমিষেই সব লণ্ডভণ্ড করে দিল।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সোমবার দুপুরে মিরপুরের ওই ১১ তলা বাণিজ্যিক ভবনের একটি শপিং মলে গিয়েছিলেন অনন্যা। হঠাৎ তৃতীয় তলায় আগুন লাগলে হুড়োহুড়ি আর ধোঁয়ার মধ্যে তিনি আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেন। সেখানে যমে-মানুষে টানাটানির পর রাতভর লড়াই করেও শেষরক্ষা হয়নি; না ফেরার দেশে চলে যান এই তরুণী বিমানসেনা।
অনন্যার চাচা আবুল কালাম আজাদ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “মেয়েটা অনেক কষ্ট করে চাকরিটা পেয়েছিল। ওর আয়েই পরিবারটা একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। গতকাল বিকেলে বিমানবাহিনী থেকে ওর ছোট বোন সুবর্ণাকে ফোন করে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেওয়া হয়। শোনার পরপরই ওর বাবা-মা ঢাকায় রওনা দেন। পরে রাতে জানতে পারি আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।”
বাড়ির উঠানে বসে বিলাপ করছিলেন অনন্যার ফুফু ফরিদা পারভীন বুলবুলি। তিনি বলেন, “নিজের সন্তানের মতো ওকে বড় করেছি। যখন ও চাকরিতে জয়েন করতে যায়, তখন ওকে বিদায় দিতেই বুক ফেটে যাচ্ছিল। আর এখন ওর লাশ আসবে, এটা কীভাবে সহ্য করব? ও তো শুধু একটা মেয়ে ছিল না, ও ছিল আমাদের সবার ভরসা।”
এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। মেধাবী ও নম্র স্বভাবের এই মেয়ের এমন অকাল মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। স্বজনরা জানিয়েছেন, অনন্যার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হবে এবং জানাজা শেষে তাঁর নানির কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকলিমা এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি ইতিমধ্যে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি। তাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারিভাবে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, সোমবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুর-২ এর ওই বাণিজ্যিক ভবনে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট কাজ করে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে অনন্যার মতো একজন সম্মুখসারির কর্মীর এমন মৃত্যু আবারও কর্মক্ষেত্রের বাইরের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল।

