ঢাকার উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ২০টি কুকুরকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তিন ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার বিকেলে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন এই সাজা ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. আবুল খায়ের, মো. অপু এবং মো. মানিক। প্রাণঘাতী ইনজেকশন, লোহার রড ও সাঁড়াশি ব্যবহার করে কুকুরগুলোকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই রায় দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯-এর দুটি পৃথক ধারায় আসামিদের সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি ধারায় ছয় মাস এবং অন্যটিতে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। উভয় সাজা একত্রে চলবে বলে আসামিদের কার্যত দুই বছর জেল খাটতে হবে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীর ধলপুর লিচু বাগান এলাকায়। সে সময় এক ভয়াবহ ও বর্বরোচিত কায়দায় রাস্তার ২০টি কুকুরকে হত্যা করে বস্তাবন্দী করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে ঘটনার পৈচাশিকতা উঠে আসে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, আসামিরা শুধু প্রাণী হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি। তারা এই নৃশংসতার প্রতিবাদকারী ও প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের ওপরও চড়াও হয়েছিলেন। ‘অ্যানিমেল লাভারস অব বাংলাদেশ’-এর কর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন তারা।
স্বেচ্ছসেবীদের পক্ষ থেকে মো. মারুফুল হক বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্য গ্রহণের পর আদালত আজ এই রায় ঘোষণা করলেন। রায়ের সময় আসামি মানিক উপস্থিত থাকলেও বাকি দুইজন পলাতক রয়েছেন।
আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন প্রাণী অধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে এই সাজা একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আইনি কাঠামোর মধ্যে এমন বিচার ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমাতে সাহায্য করবে।
বেঞ্চ সহকারী সাইম উদ্দিন জানান, কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিদের আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। পলাতক দুই আসামির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। লোহার রড ও সাঁড়াশি দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি বিষাক্ত ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়েছিল অবলা প্রাণীগুলোর ওপর। এই নিষ্ঠুরতা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
২০২৪ সালের মে মাসে এই মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর বাদীপক্ষের তিনজন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ ভুক্তভোগী প্রাণীদের পক্ষে বিচারের বাণী ঘোষিত হলো।
সংবাদটির পেছনের গল্পটি কেবল আইনি লড়াইয়ের নয়, বরং মানুষের অমানবিকতার বিরুদ্ধে সহমর্মিতার জয়। শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভবঘুরে কুকুরগুলো প্রায়শই এমন নির্যাতনের শিকার হয়, যার খুব কমই আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৯ সালের প্রাণী কল্যাণ আইন কার্যকর হওয়ার পর এটি অন্যতম বড় একটি সাজা। এটি সমাজের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, মানুষের মতো প্রাণীদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত।
আদালতের এই আদেশের পর মানিককে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, পলাতক বাকি দুই আসামিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ধলপুরের সেই লিচু বাগান এলাকায় এক সময় যে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল, আজকের রায়ে সেখানে এক ধরণের স্বস্তি নেমে এসেছে। যারা প্রতিদিন এই প্রাণীগুলোকে খাবার দিতেন বা যত্ন নিতেন, তাদের কাছে এই বিচার এক বড় প্রাপ্তি।

