ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল নয়টা ছুঁইছুঁই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অফিসের দুয়ার খোলার কথা ঠিক এই সময়েই। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভূমি কার্যালয়ে দৃশ্যপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। সেখানে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দেখা নেই; বরং মূল ফটকে ঝুলছিল বিশাল এক তালা। আর সেই তালাবদ্ধ অফিসের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সরকারের ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বুধবার সকালে কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এই ভূমি অফিসে পরিদর্শনে যান প্রতিমন্ত্রী। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা যাচাই করতে গিয়ে নিজেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অফিসের দায়িত্বশীল কেউ উপস্থিত না থাকায় সেখানে অপেক্ষমাণ সেবাগ্রহীতাদের অসহায়ত্ব নিজে চোখে পরখ করেন কায়সার কামাল।
প্রতিমন্ত্রী যখন অফিসের সামনে পৌঁছান, তখন চারপাশ জনশূন্য। দীর্ঘ প্রায় ৩০ মিনিট পর জনৈক এক ব্যক্তি এসে অফিসের তালা খোলেন। কিন্তু ভেতরে ঢোকার পরও দেখা যায়নি কোনো কর্মকর্তার মুখ। নিজ কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিমন্ত্রীকে অপেক্ষা করতে হয় অধস্তনদের জন্য। এই ঘটনায় ক্ষোভ লুকাতে পারেননি সরকারের এই নীতিনির্ধারক।
অফিস কক্ষে অবস্থানকালে সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, “আমরা আজ রেন্ডমলি এই অফিসটি পরিদর্শনের জন্য নির্বাচন করেছি। এখানে এসে যা দেখলাম তা মোটেও কাম্য নয়। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৯টায় অফিস খোলার কথা থাকলেও এখন ৯টা বেজে ১০ মিনিট পার হয়ে গেছে। অথচ এখনো তালাবদ্ধ ছিল এই সেবা প্রতিষ্ঠান।”
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, জনগণের সেবার দোরগোড়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি, এটি তারই অংশ। প্রান্তিক মানুষ যেন তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।”
দীর্ঘ সময় পর অফিসে প্রবেশের পর প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং ঝুলে থাকা ফাইলের খোঁজ নিতে শুরু করেন। তিনি জানান, কেন এই বিলম্ব এবং কেন সাধারণ মানুষ সময়মতো সেবা পাচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা হবে। যারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই শিথিলতা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আইন সবার জন্য সমান। আপনি সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়ে সাধারণ মানুষকে অপেক্ষায় রাখতে পারেন না। আজকের এই অগ্রহণযোগ্য আচরণের ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে।” তিনি আরও জানান, শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, সারাদেশের ভূমি অফিসগুলোতে এ ধরনের আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও প্রতিমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফর নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ভূমি অফিসে দালালের দৌরাত্ম্য এবং কর্মকর্তাদের দেরিতে আসা দীর্ঘদিনের সমস্যা। আজ প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতিতে সেই সত্যই যেন জনসমক্ষে চলে এলো। প্রতিমন্ত্রী বর্তমানে ওই কার্যালয়েই অবস্থান করছেন এবং কর্মকর্তাদের উপস্থিতির পর তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন বলে জানা গেছে।
সিদ্ধিরগঞ্জের এই ঘটনাটি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অনিয়মকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু পরিদর্শন নয়, ভূমি অফিসের এই ‘অচলায়তন’ ভাঙতে স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আসবে। প্রতিমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, দুর্নীতিমুক্ত ভূমি সেবা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার এই সংগ্রাম চলবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিমন্ত্রীর এই সফরের পর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্বরতদের কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হতে পারে। মাঠ পর্যায়ে সরকারি সেবার মান বাড়াতে এ ধরনের তদারকি আগামীতে আরও জোরদার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

