নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রান্তিক মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। গ্রামগঞ্জের ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার এই পরিকল্পনাটি নিঃসন্দেহে জনবান্ধব। তবে মাঠপর্যায়ে এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কার কথা জানিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে উঠে এসেছে এই কর্মসূচির ভেতরের ও বাইরের নানা প্রতিকূলতার চিত্র।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদরা স্পষ্ট করেই বলেছেন, এই মুহূর্তে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে টান পড়বে, তা সামাল দেওয়াই হবে মূল পরীক্ষা।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও ফ্যামিলি কার্ডের অংক
সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানের উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে দেখা যায়, প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনতে বছরে প্রায় ৯,৬০০ কোটি থেকে ১২,০০০ কোটি টাকা খরচ হবে। যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ শতাংশ। সামাজিক সুরক্ষা বলয় বাড়াতে এটি একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হতে পারে, এমনকি ভবিষ্যতে সর্বজনীন মৌলিক আয় (UBI) নিশ্চিতের পথও দেখাতে পারে এটি।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অর্থের সংস্থান নিয়ে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিশাল অংকের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য মোটেও সহজ হবে না। কেবল টাকা থাকলেই হবে না, সেই টাকা সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করাটাও এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা না থাকলে এই মহতী উদ্যোগটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
সুবিধাভোগী নির্বাচন: বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নাকি রাজনৈতিক প্রভাব?
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রকৃত হকদার কারা, সেটি নির্ধারণ করা নিয়ে বরাবরই বিতর্ক থাকে। অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রচলিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক তদবিরের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ করলে প্রকৃত বঞ্চিতরা তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। এর বদলে তিনি বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোকপাত করেছেন—তা হলো আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তার মতে, নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো করে কার্ড বিতরণ শুরু করলে তাতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীরা অনেক সময় ভোট ব্যাংক ভারী করতে নিজের পছন্দের মানুষকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। এতে তথ্যের যেমন ঘাটতি থাকে, তেমনি প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হন।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন বনাম রূঢ় বাস্তবতা
সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান থেকে পরবর্তী ৯ বছরে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হলে অর্থনীতিকে প্রতি বছর গড়ে ৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে হবে। সিপিডি এই লক্ষ্যকে ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানের বৈশ্বিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের মধ্যে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা প্রায় অলৌকিক বিষয়। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান উদ্যোগগুলোর তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী পরিকল্পনা। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো রাজস্ব আহরণ বাড়ানো। কিন্তু সেখানেও পরিসংখ্যান খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
রাজস্ব ফাঁকি ও কর-জিডিপি অনুপাতের সংকট
২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬.৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লক্ষ্য ছোঁয়াও বেশ কঠিন হবে। যদি সত্যিই ২০৩১ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১১.৫ শতাংশে নিতে হয়, তবে প্রতি বছর অন্তত ০.৯ শতাংশ হারে উন্নতি করতে হবে।
তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, যদি কার্যকর সংস্কার করা যায়, তবে স্বল্পমেয়াদে জিডিপির অতিরিক্ত ২ শতাংশ রাজস্ব আদায় সম্ভব। এতে ২০৩১ সালে অনুপাতটি ১৩.৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কর প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন। অন্যথায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে হিমশিম খেতে হবে।
বাজেট ঘাটতি ও আগামীর পথ
সিপিডির মতে, বাজেট ঘাটতি যদি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হয়, তবে কেবল রাজস্ব বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে চরম মিতব্যয়ী হতে হবে। তৌফিক ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, লক্ষ্য অর্জন শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করছে।
সামগ্রিকভাবে, নতুন সরকারের সামনে যে ১০টি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, কিন্তু অর্থনীতির বাস্তব সমীকরণ বলছে, সামনের দিনগুলোতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড যেন কেবল একটি কার্ড না হয়ে সত্যিকারের স্বস্তি হয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

