নির্বাচনী প্রচারণার মাঠ যখন প্রতিপক্ষকে কড়া ভাষায় আক্রমণের চিরাচরিত রীতিতে উত্তপ্ত, তখন এক ভিন্ন সুর শোনা গেল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কণ্ঠে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পল্লবীর ২ নং ওয়ার্ডের লাল মাঠে আয়োজিত এক পথসভায় তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘গিবত’ গেয়ে বা সমালোচনা করে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। বরং জনগণের জীবনমান কীভাবে উন্নত করা যায়, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই তার দল বেশি মনোযোগী।
বিকেল ৬টার পর জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “আজকে এই জনসভায় দাঁড়িয়ে আমি প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অনেক কথাই বলতে পারতাম। তাদের অনেক ভুল-ত্রুটি নিয়ে গিবত গাইতে পারতাম। কিন্তু তাতে কি আপনাদের কোনো লাভ হবে? জনগণের কোনো লাভ হবে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের ভাগ্যের মেগা পরিবর্তন।”
ইশতেহারের মূল বিষয়গুলো পুনর্ব্যক্ত
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দুই দিন আগে ঘোষিত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বিএনপি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়ছে না, বরং একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ দিয়েছে। আমরা আমাদের ইশতেহারে স্পষ্ট করেছি—কীভাবে বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, কীভাবে নারীদের স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং কীভাবে দেশের ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।”
কৃষকদের জন্য বড় ঘোষণা: ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ
পল্লবীর এই সভায় তারেক রহমান কৃষকদের জন্য এক বড় ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “বিএনপি ১২ তারিখের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ (সুদসহ) সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেওয়া হবে। এছাড়া প্রতিটি কৃষক পরিবারের কাছে ‘কৃষি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা সরাসরি বীজ, সার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন।” একইভাবে দুস্থ ও নিম্নবিত্ত নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
‘মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি’
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, গত ১৬ বছরে দেশে মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, “আমরা দেখেছি বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো ‘মেগা পরিবর্তন’ হয়নি। ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের এই অর্থ দেশে থাকলে আজ আমাদের প্রতিটি শিক্ষিত যুবক কর্মসংস্থান পেত।”
জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “১৪০০ শহীদের রক্ত এবং ২০ হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ বৃথা যেতে পারে না। তাদের এই আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে নিজের ভোট দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। ১২ ফেব্রুয়ারি সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমরা এই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করেছি।”
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হবে না যদি দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা না যায়। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এমনকি নিজ দলের কেউ অনিয়মে জড়ালে তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি সতর্কবার্তা দেন।
পথসভার শেষে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়ে দেশ গড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আগামী ১৩ তারিখ থেকে আমরা জনগণের জয়যাত্রা শুরু করতে চাই। আমাদের মূল দর্শন হবে—সবার আগে বাংলাদেশ।”

