ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলে কাঁপছে গোটা দেশ, আর এই উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা-১৮ আসন। রাজধানীর এই জনপদটি এক অদ্ভুত বৈচিত্র্যের সাক্ষী। একদিকে উত্তরার সুপরিকল্পিত অভিজাত আবাসিক এলাকা, চওড়া রাস্তা আর আকাশচুম্বী ফ্ল্যাটবাড়ি; অন্যদিকে উত্তরখান ও দক্ষিণখানের ঘিঞ্জি গলি, জলাবদ্ধতা আর নাগরিক সেবার তীব্র অভাব। এই দুই বিপরীতধর্মী জনপদের কয়েক লাখ ভোটারের মন জয় করাই এখন প্রার্থীদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব বলছে, এই আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন মূলত দুইজন—বিএনপির এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এবং এনসিপি মনোনীত ১১-দলীয় জোটের তরুণ প্রার্থী আরিফুল ইসলাম। ধানের শীষ আর শাপলা কলির এই লড়াই এখন উত্তরার ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে দক্ষিণখানের চায়ের দোকান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
উত্তরা এলাকায় নির্বাচনী হাওয়া কিছুটা শান্ত হলেও তা বেশ হিসাবি। এখানকার শিক্ষিত ও সচেতন ভোটাররা মূলত নিরাপত্তা, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। ৫ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ও তরুণ ভোটার হিমেল আহমেদ মনে করেন, এবার ভোটারদের নীরবতা অনেক বেশি। তবে তার মতে, নির্বাচনী ময়দানে বড় কোনো মিত্র না থাকায় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান বেশ শক্তিশালী।
ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকায়। সেখানে সরু গলি আর অপরিকল্পিত বসতির মাঝে প্রার্থীদের প্রচারণার ধুম অনেক বেশি। এই এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘ ১৭ বছরের বঞ্চনার অভিযোগ তুলছেন। জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট আর বেহাল রাস্তাঘাটের কারণে এখানকার ভোটাররা এবার কোনো ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে ভুলতে রাজি নন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মোজাম্মেল মিয়ার মতে, যিনি প্রকৃত সমস্যার সমাধান করবেন এবং সংসদে এলাকাবাসীর কথা বলবেন, ভোট তাকেই দেবেন।
বিএনপি প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন তার প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার ও দুর্নীতিমুক্ত নগর ব্যবস্থাপনার ওপর। তিনি অভিযোগ করেছেন, গত দেড় দশকে স্বাস্থ্য খাতে হওয়া বিপুল অর্থ লুটপাটের কারণে মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিজয়ী হলে রাজউক ও সিভিল এভিয়েশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তার মতে, পরিকল্পিত নগরায়ন হলে বড় বড় দুর্ঘটনা এবং জানমালের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।
অন্যদিকে, ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম জোর দিচ্ছেন দীর্ঘদিনের নাগরিক সংকট সমাধানের ওপর। তুরাগ এলাকায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, মা-বোনেরা বছরের পর বছর গ্যাস সংকটে ভুগছেন, অথচ বিল দিচ্ছেন ঠিকই। তিনি নির্বাচিত হলে গ্যাস সমস্যা সমাধান ও নারীদের মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। একটি ‘নীরব গণতান্ত্রিক বিপ্লবের’ মাধ্যমে ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার ডাক দিচ্ছেন শাপলা কলি প্রতীকের এই তরুণ নেতা।
এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর পাশাপাশি মাঠে রয়েছেন নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না (কেটলি প্রতীক)। এছাড়াও হাতপাখা, হরিণ, মোমবাতি ও মই প্রতীকের পোস্টার-ব্যানার দেখা গেলেও ভোটারদের মাঝে তাদের প্রভাব খুব একটা জোরালো নয়। আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি আহত হয়ে মাঠের বাইরে থাকায় তার সক্রিয়তা এখন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রার্থীদের প্রচারণার ধরনও তত পাল্টাচ্ছে। উত্তরার ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে তারা যাচ্ছেন আধুনিক উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে, আর প্রান্তিক এলাকায় দিচ্ছেন জলাবদ্ধতা মুক্তির প্রতিশ্রুতি। শেষ পর্যন্ত উত্তরার ‘এলিট ভোট’ আর দক্ষিণখানের ‘প্রান্তিক ভোট’—কার ভাগ্যে জোটে, তা দেখার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

