নির্বাচনী প্রচারণার মাঠ যত সরগরম হচ্ছে, রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও ততোটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে মতপার্থক্যের রেখা। রাজধানীর বাড্ডায় এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি প্রশ্ন তুললেন বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে। ৫৯ জন ‘ভয়াবহ ঋণখেলাপি’ ও ‘ব্যাংক ডাকাত’ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, এদের বগলে নিয়ে দুর্নীতি দমনের কথা বলা হাস্যকর।
রোববার সকালে বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট খেলার মাঠে এই জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল ঢাকা-১১ আসনের ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সমর্থনে। সেখানেই প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির নাম সরাসরি উচ্চারণ না করেও দলটির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নিজের ঘর থেকে পরিচ্ছন্নতা শুরু না করলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরা সম্ভব নয়।
জামায়াত আমির তার ভাষণে বলেন, “একটি দল প্রায়ই বলে তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি দমন করবে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুটের অভিযোগ, যারা জনগনের টাকা মেরে ঋণখেলাপি হয়েছে, তাদের কেন এমপি বানানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে? চোর-ডাকাতদের পাশে বসিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা শুনলে প্যাঁচাও হাসবে।” তার এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য উপস্থিত নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি দেশের ইতিহাসের তিন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ—১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের গণ-আকাঙ্ক্ষার তুলনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ যখন ‘আওয়ামী জাহেলিয়াত’ থেকে মুক্ত হলো, ঠিক তার পরদিন অর্থাৎ ৬ আগস্ট থেকেই একদল মানুষ আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে গেছে। দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও মিথ্যে মামলার মাধ্যমে মানুষকে জিম্মি করার রাজনীতি শুরু হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষ্যে উঠে আসে বর্তমান সময়ের এক রূঢ় বাস্তবতার কথা। তিনি বলেন, “আমরা কি এজন্য লড়াই করেছিলাম যে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর আবার নতুন চাঁদাবাজ তৈরি হবে? আজ ব্যবসায়ীরা জিম্মি, ফুটপাতের ভিক্ষুকের কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। যারা বিগত ১৫ বছর দেশের বাইরে নিরাপদে ছিলেন, তারা ফিরে এসে এখন খুনের মামলার ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা দাবি করছেন। এটা আমরা হতে দিতে পারি না।”
যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বেকার ভাতার মতো ‘দয়া’ দেখিয়ে তরুণদের অপমান করতে চায় না জামায়াত ও তাদের জোট। পরিবর্তে তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিতে চায়। তিনি পুরনো ‘বস্তাপচা’ রাজনীতি বর্জন করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের মাধ্যমে ‘রক্তের ঋণ’ শোধ করার আহ্বান জানান ভোটারদের প্রতি।
অতীতের ১০ টাকা কেজি চালের প্রতিশ্রুতিকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি বর্তমানের বিভিন্ন ‘কার্ড’ প্রথাকেও লাল কার্ড দেখানোর ডাক দেন। তিনি বলেন, আগামীতে যদি ‘ইনসাফের সরকার’ ক্ষমতায় আসে, তবে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী—আইনের চোখে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবেন না। এমনকি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক লড়াই করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি ঘোষণা করেন, তরুণ প্রজন্মের এই নেতা যদি নির্বাচিত হন, তবে মন্ত্রিসভায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে। ডা. শফিকুর রহমান একটি রূপক ব্যবহার করে বলেন, “আমরা তরুণদের পাইলট হিসেবে বসিয়ে নিজেরা পেছনের সিটে প্যাসেঞ্জার হয়ে থাকতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, এই যুবসমাজ আমাদের হতাশ করবে না।”
জনসভায় বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। এছাড়াও ১১-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য প্রদান করেন। সকাল থেকেই বাড্ডা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ ও দলীয় সমর্থকরা জনসভাস্থলে ভিড় জমান। বক্তাদের কণ্ঠে বারবারই প্রতিধ্বনিত হয়েছে সংস্কার এবং পরিবর্তনের দাবি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত আমিরের এই কঠোর অবস্থান জোটের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির প্রতি তার সরাসরি চ্যালেঞ্জ নির্বাচনী মাঠে ভোটারদের মেরুকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ৬ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি মূলত একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক কাঠামোর দাবিই জোরালোভাবে তুলে ধরলেন।

