পবিত্র রমজান মাস আসতে এখনও কিছুদিন বাকি, কিন্তু ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুরের বাজার এখনই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের পাতে খেজুর তোলা যখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন প্রশ্ন উঠেছে সরকারের নেওয়া শুল্ক ছাড়ের কার্যকারিতা নিয়ে। আমদানিকারকদের জন্য সরকার ট্যাক্স কমিয়ে দিলেও সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে খসছে বাড়তি টাকা। গত মাত্র চার সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের খেজুরের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
রাজধানীর খুচরা বাজারগুলো ঘুরে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। যে খেজুরকে সরকার নথিপত্রে ‘বিলাসবহুল পণ্য’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে, সাধারণ মানুষের কাছে তা কেবল ধর্মীয় বা পুষ্টির প্রয়োজনে জরুরি। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই প্রয়োজন মেটানোই অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শুল্ক কমানোর পর যেখানে দাম কমার কথা ছিল, সেখানে উল্টো ঊর্ধ্বগতি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্কের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। লক্ষ্য ছিল একটাই—সামনে রমজান, তাই বাজারে যেন খেজুরের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে এবং দাম সাধারণের নাগালে থাকে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই ১০ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ছিটেফোঁটাও প্রভাব ফেলেনি। উল্টো সিন্ডিকেট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে বাজার এখন টালমাটাল। এমনকি সাধারণ মানের খেজুরও এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ঢাকার অন্যতম বড় পাইকারি আড়ত বাদামতলী থেকে শুরু করে কারওয়ান বাজার বা মানিকনগরের খুচরা দোকান—সবখানেই একই সুর। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিকারকদের কাছ থেকে চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে বলে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার তদারকির অভাবে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা সাধারণ মানের জাহিদী খেজুরের দিকে তাকালে দামের এই লাফ বোঝা যায়। মাসখানেক আগে যে জাহিদী খেজুর প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় কেনা যেত, এখন তা ৩৫০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে মধ্যবিত্তের পছন্দের এই জাতটির দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা। উন্নত মানের খেজুরের ক্ষেত্রে এই ফারাক আরও ভয়াবহ।
বিলাসবহুল ইরানি মরিয়ম খেজুরের দাম এখন আকাশচুম্বী। জানুয়ারির শুরুতে যা ১০০০ থেকে ১১০০ টাকার মধ্যে ছিল, এখন তা ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। মাসের ব্যবধানে এই জাতের দাম বেড়েছে প্রায় ২৫০ টাকা। একইভাবে কালমি মরিয়ম কেজিতে ২০০ টাকা বেড়ে এখন ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুক্কারি জাতের খেজুরও পিছিয়ে নেই, ৮০০ টাকার নিচে এখন ভালো সুক্কারি মেলা ভার।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা অসহায়। মানিকনগরের ব্যবসায়ী মহসিন মোল্লা সরাসরিই আঙুল তুললেন সিন্ডিকেটের দিকে। তিনি বলেন, “সরকার কাগজে-কলমে শুল্ক কমালো ঠিকই, কিন্তু সেই সুবিধা আমাদের মতো খুচরা বিক্রেতা বা সাধারণ ক্রেতার কাছে পৌঁছায়নি। আমদানিকারকরা যদি দাম না কমায়, তবে আমাদের কী করার আছে?” তার মতে, বাজারে পণ্য আছে, কিন্তু হাতবদল হওয়ার প্রতিটি ধাপে দাম বেড়ে যাচ্ছে অস্বাভাবিক হারে।
এদিকে পাইকারি বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও স্বস্তিদায়ক নয়। বাদামতলীর পাইকারি বাজারে ৫ কেজির এক কার্টন জাহিদী খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়, যা কেজিতে পড়ে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা। অথচ সেই একই খেজুর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকায়। অর্থাৎ পাইকারি আর খুচরার মাঝখানে কেজিতে ১০০ টাকার বেশি ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই বিপুল মুনাফা কার পকেটে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ জবাব নেই।
আজুয়া, মাবরুম কিংবা মেডজুলের মতো প্রিমিয়াম জাতের খেজুরের দাম এখন সাধারণের সাধ্যের অনেক বাইরে। আজুয়া ৯৫০ টাকা, মাবরুম ১২০০ টাকা আর মেডজুল ১৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, খেজুর এখন আর পুষ্টির উৎস নয়, বরং আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবার এখন থেকেই চিন্তিত যে ইফতারে খেজুরের বদলে অন্য কিছু ভাবতে হবে কি না।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা অবশ্য বিশ্ববাজারের দোহাই দিচ্ছেন। বাদামতলীর ব্যবসায়ী এমদাদুল করিমের মতে, সৌদি আরব বা ইরানেই এবার খেজুরের দাম বেশি। তিনি দাবি করেন, আমদানিকারকরা সেখানে বেশি দামে কিনছেন বলেই অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। তবে তিনি আশার বাণীও শুনিয়েছেন—গত বছরের এই সময়ের তুলনায় দাম নাকি কিছুটা কম। যদিও সাধারণ ভোক্তাদের পকেট সেই হিসাবের সাথে মোটেও মিলছে না।
বাংলাদেশে রমজানের আগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াটা যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। খেজুরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ও তদারকি সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তাকে দায়ী করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আমদানিকারক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি না বাড়ালে সাধারণ মানুষ কোনো সুবিধার সুফল পাবে না।
ইফতারের টেবিলে খেজুরের মিষ্টতা আর তৃপ্তির বদলে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সাশ্রয়ের দুশ্চিন্তা। বাজার এভাবে চলতে থাকলে রমজানের মূল সময়টায় পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো কি শেষ মুহূর্তে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, নাকি শুল্ক ছাড়ের সেই ১০ শতাংশ কেবল ব্যবসায়ীদের পকেটেই থেকে যাবে।

