সিলেটের ঐতিহাসিক সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দান আজ রূপ নিয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে আয়োজিত এই নির্বাচনী জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক দুর্নীতিমুক্ত ও শোষণহীন নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, “আল্লাহ যদি আমাদের এ দেশের দায়িত্ব দেন, তবে এক ইঞ্চি মাটির উপরেও কেউ আর চাঁদাবাজির হাত বাড়ানোর সাহস পাবে না।”
শনিবার বিকেলে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত এই জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান গত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নির্মোহ বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, এ দেশের প্রতিটি পেশার মানুষ—কামার, কুমার, জেলে থেকে শুরু করে সাংবাদিক ও আলেম-ওলামা—সবাই বিভিন্ন সময় জুলুমের শিকার হয়েছেন। তিনি নিজেকে ‘সিলেটের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমি এখানে জামায়াতের আমির হিসেবে আসিনি, আপনাদেরই একজন স্বজন হয়ে দাঁড়িয়েছি। আমাদের এবার একটি সুযোগ দিন; আমরা আপনাদের মালিক হব না, আমরা হব আপনাদের জানমালের পাহারাদার।”
দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিগত দশকগুলোতে যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের কাউকেই শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “পাচারকৃত প্রতিটি টাকা জনগণের হক। আমরা যদি জনগণের সেবক হতে পারি, তবে এই টাকা ফিরিয়ে আনতে ওই সব লুটেরাদের মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সব বের করে আনা হবে।”
সিলেটের আঞ্চলিক উন্নয়ন ও প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, সিলেট প্রবাসী নির্ভর এলাকা হওয়া সত্ত্বেও সুপেয় পানি, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার মতো মৌলিক সমস্যায় জর্জরিত। তিনি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ করার এবং প্রবাসীদের মরদেহ সরকারি খরচে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি গ্যারান্টি দেওয়ার ঘোষণা দেন। এছাড়া চা শ্রমিকদের মেধাবী সন্তানদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিশেষ ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা চাই না রাজার ছেলে কেবল রাজাই হবে; মেধাবী হলে একজন শ্রমিকের সন্তানও এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে।”
বিগত ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট আল্লাহ যখন জাতিকে স্বস্তি দিলেন, জামায়াত কোনো প্রতিশোধ নেয়নি। বরং সেজদায় পড়ে শুকরিয়া আদায় করেছে। তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী এ দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত দল হওয়া সত্ত্বেও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। মাদক, সন্ত্রাস ও অস্ত্রের ঝনঝনানি মুক্ত এক ‘অস্থিরতাহীন’ সিলেট গড়ার যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি।
জনসভার শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান সিলেট ও এর আশপাশের আসনের জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেন এবং ভোটারদের উদ্দেশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান। মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল জনসভায় কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে আলিয়া মাদরাসা মাঠ ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী সড়কগুলোতেও হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে, যা আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির এক বড় মহড়া হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

