দীর্ঘ দুই দশক পর উত্তরবঙ্গের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ে পা রেখেই সাধারণ মানুষের মন জয়ের বড় এক দান চেলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে ‘দেশ পুনর্গঠনের লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ (সুদসহ) মওকুফ করা হবে। একই সাথে দুস্থ মানুষের এনজিও ঋণের বোঝা লাঘবেও সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল বড় মাঠে আয়োজিত এই জনসভায় তারেক রহমান কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যই দেননি, বরং তার দল ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রের কাঠামো কেমন হবে, তার একটি রূপরেখা বা ‘নতুন সামাজিক চুক্তি’র বিস্তারিত তুলে ধরেন। বেলা সাড়ে ১১টায় হেলিকপ্টারযোগে সভাস্থলে পৌঁছালে জনসমুদ্রের গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো শহর।
নির্বাচনী ইশতেহারের মূল পয়েন্টগুলো ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সামনে ব্যাখ্যা করে তারেক রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির প্রাণ হলো কৃষি। আর সেই কৃষককে ঋণের জালে বন্দি রেখে দেশ এগোতে পারে না। তাই বিএনপি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র ঋণ মওকুফের ফাইল অনুমোদন করা হবে। এছাড়া কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ এবং প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পর্যাপ্ত হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) স্থাপনের অঙ্গীকার করেন তিনি।
নারীদের ক্ষমতায়নে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের মা-বোনেরা শুধু ঘরের কাজ করবেন না, তারা হবেন অর্থনীতির অংশীদার।” এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি প্রতিটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণীর নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে তারা নিজেদের ছোটখাটো প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে পারেন।
তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য আর ঢাকা বা বিদেশে পাড়ি জমাতে হবে না। এই জনপদেই গড়ে তোলা হবে ‘আইটি পার্ক’ বা ‘আইটি হাব’, যেখানে বসে স্থানীয় মেধাবীরা আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তির কাজ করতে পারবেন। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া বিমানবন্দর চালু এবং এই অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনেরও আশ্বাস দেন তিনি।
বক্তৃতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা যে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভেদ থাকবে না। আমরা এমন এক রাষ্ট্র চাই যেখানে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেকে তার প্রাপ্য সম্মান পাবে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার একটাই পরিচয় হবে যে আমরা বাংলাদেশী।”
সমাবেশের শেষ পর্যায়ে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের আসনগুলোর প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং ভোটারদের অনুরোধ জানান যাতে তারা ১২ তারিখ পর্যন্ত সব বাধা উপেক্ষা করে ধানের শীষের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “আপনাদের একটি ভোট কেবল জয় নিশ্চিত করবে না, বরং আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।”
শীতের রোদ মাথায় নিয়ে হাজার হাজার মানুষ যখন তারেক রহমানের কথা শুনছিলেন, তখন মাঠের আবহেই স্পষ্ট ছিল যে উত্তরাঞ্চলের নির্বাচনী সমীকরণে এই জনসভা এক বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।

