উত্তরবঙ্গের হিমেল হাওয়ায় উত্তপ্ত ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহাসিক বড় মাঠ। হাজারো মানুষের স্লোগান আর করতালির মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হলেন নির্বাচনী গণসমাবেশে। তার কণ্ঠে ছিল বিগত দিনের লড়াইয়ের স্মৃতি আর আগামী দিনের রাষ্ট্র সংস্কারের এক দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, আসন্ন নির্বাচন কেবল ভোটের লড়াই নয়, বরং এক ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে পুনরায় গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সংগ্রাম।
শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশে তারেক রহমান দীর্ঘ সময় কথা বলেন। তিনি বলেন, গত এক দশকে এ দেশের মানুষ শুধু তাদের ভোটাধিকার হারায়নি, হারিয়েছে কথা বলার মৌলিক স্বাধীনতাও। নির্যাতিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়েছে এ দেশের আকাশ। এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। জনগণের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়নই হবে বিএনপির মূল লক্ষ্য।
বিগত সরকারের শাসনামলের সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, এ দেশের তরুণ সমাজ কর্মসংস্থানের অভাবে আজ দিশেহারা। মা-বোনেদের যোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি, আর কৃষকদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক সংকটের কিনারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, এ দেশের প্রকৃত মালিক কোনো দল বা ব্যক্তি নয়, বরং সাধারণ জনগণ। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সমাবেশে তারেক রহমান উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য এক সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন রোডম্যাপ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গ হলো বাংলাদেশের কৃষির হৃৎপিণ্ড। কিন্তু বছরের পর বছর এই অঞ্চলের কৃষকরা অবহেলার শিকার হয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কৃষকদের ঋণের বোঝা লাঘবে কৃষিঋণ মওকুফের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলো নিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনায় উঠে আসে নতুন আশার কথা। তিনি জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকল, রেশম কারখানা এবং চায়ের বাগানগুলো পুনরায় সচল করা হবে। এটি কেবল শিল্পায়ন নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার বেকারের জন্য ঘরে বসেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য বিএনপির ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা চাই দক্ষ জনশক্তি। কেবল ডিগ্রিনির্ভর শিক্ষা নয়, কারিগরি ও কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের স্বাবলম্বী করা হবে। বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি আধুনিক আইটি পার্ক বা আইটি হাব স্থাপনের ঘোষণা দেন তিনি। যাতে স্থানীয় তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং বা তথ্যপ্রযুক্তির কাজ করতে ঢাকা বা বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য না হয়।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এক নতুন মডেলের কথা শোনান তারেক রহমান। তিনি জানান, বিএনপির পরিকল্পনা রয়েছে গ্রামে গ্রামে ‘হেলথকেয়ার কর্মী’ নিয়োগ দেওয়ার। এই কর্মীরা মূলত মা ও শিশুদের ঘরে গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবেন। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিতে এটি হবে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের জনদাবি পূরণেরও আশ্বাস দেন তিনি।
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করার ব্যাপারেও জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বিশ্বাস করেন, বিমানবন্দরটি চালু হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আসবে। যা ঠাকুরগাঁওকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করবে।
তার বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ছবি। তারেক রহমান বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে কেউ বিভাজিত হবে না। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ কিম্বা খ্রিস্টান—সবার পরিচয় হবে তারা এই দেশের নাগরিক। মেধা আর যোগ্যতাই হবে সবকিছুর মাপকাঠি। মানুষ যাতে নিরাপদে ব্যবসা করতে পারে এবং নারীরা যাতে নির্ভয়ে পথে চলতে পারে, তেমন এক নিরাপদ সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
সমাবেশের শেষ ভাগে তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতার বার্তা দেন। তিনি বলেন, ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং মানুষের ভালোবাসা নিয়ে সামনে এগোতে হবে। জনগণের সমর্থন নিয়েই বিএনপি দেশ পুনর্গঠনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চায়। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের আবেগ আর উদ্দীপনা দেখে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আগামী দিনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
বিকেল গড়ানোর সাথে সাথে সমাবেশ শেষ হলেও মাঠ জুড়ে থেকে যায় এক নতুন আশার গুঞ্জন। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে তখন ফিরছিল কৃষি ঋণ মওকুফ আর কলকারখানা চালুর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো। জনসভাটি কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মানুষের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন সূচনার বার্তা দিয়ে শেষ হয়।

