আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও মাঠ প্রশাসনের প্রস্তুতি তদারকিতে এখন দেশজুড়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি মিলনায়তনে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় যোগ দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান, পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এখন আর কোনো ভীতি কাজ করছে না এবং আগামী নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অস্থিতিশীলতা ও ‘মব ভায়োলেন্স’ নিয়ে জনমনে যে শঙ্কা ছিল, তা উড়িয়ে দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “বর্তমানে মব ভায়োলেন্স বলে কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা রয়েছে।” নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ মহল অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলেও সরকার তা কঠোর হাতে দমনে প্রস্তুত বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
প্রার্থীদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা ও আচরণবিধি
মতবিনিময় সভায় রাজশাহী বিভাগের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে লড়তে আসা প্রার্থীদের অবশ্যই আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। কোনো প্রার্থী যদি জনগণের সাথে অশোভন আচরণ করেন বা নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করেন, তবে সমাজই তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, “প্রার্থীরা যদি মাত্রাতিরিক্ত কিছু করার চেষ্টা করেন, তবে প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
উপদেষ্টা আরও জানান, নির্বাচন উপলক্ষে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে যৌথ বাহিনী। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
৯ লাখ সদস্যের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়
রাজশাহীর এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাব (বর্তমানে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স – এসআইএফ হিসেবে প্রস্তাবিত) মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। সভায় জানানো হয়, এবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ সেনাসদস্য সরাসরি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, এবারের নির্বাচনে কোনো কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্ব সহ্য করা হবে না। কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তার কড়া নির্দেশনা ছিল—ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হলে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি নির্বাচনের দিন প্রার্থীর বাড়ি বা ক্যাম্প থেকে কোনো ধরনের খাবার গ্রহণ করার ওপরও তিনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
প্রযুক্তি ও সক্ষমতার সমন্বয়
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে এবার কেবল জনবল নয়, প্রযুক্তির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা অ্যাপ, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বডি-ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া স্পর্শকাতর কেন্দ্রগুলোতে ড্রোন নজরদারি এবং ডগ স্কোয়াড প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাজশাহী বিভাগের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে এই দীর্ঘ বৈঠকে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথ সহজ করা এবং ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনের এই সজাগ অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মাঝে আস্থার সঞ্চার করছে।

