দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মহাপরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে এক জমকালো অনুষ্ঠানে দলটির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। এই ইশতেহারের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল এর প্রচ্ছদ, যেখানে জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদ আবু সাঈদ, আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক আবরার ফাহাদ এবং শরীফ ওসমান বিন হাদির ছবি পাশাপাশি স্থান পেয়েছে।
আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান যখন ইশতেহারটি পাঠ করছিলেন, তখন হলজুড়ে এক ধরণের গাম্ভীর্য বিরাজ করছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আবু সাঈদ ও আবরার ফাহাদের ছবি ব্যবহারের মাধ্যমে জামায়াত মূলত দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং আধিপত্যবাদবিরোধী সেন্টিমেন্টকে নিজেদের পালে টানার চেষ্টা করেছে। ইশতেহারের প্রথম অংশের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে— ‘জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ’।
আট ভাগে বিভক্ত রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা
জামায়াতের এই ইশতেহারটি মূলত আটটি প্রধান ভাগে বিভক্ত, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে স্পর্শ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। জামায়াত দাবি করেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে সংসদকে সত্যিকারের কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করবে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় এমন সংস্কার আনবে যাতে আর কখনো কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
ইশতেহারে স্থান পাওয়া প্রধান ১০টি সংস্কার প্রস্তাব হলো: ১. শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ২. একটি কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বমূলক জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করা। ৩. সুশাসন নিশ্চিতে জনপ্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা। ৪. দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। ৫. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও আইনি জটিলতা নিরসন। ৬. তথ্য ও গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
কূটনীতিক ও সুধী সমাজের সরব উপস্থিতি
শেরাটন হোটেলের এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা জামায়াতের এই ভিশন ডকুমেন্ট প্রকাশের সাক্ষী হন। এছাড়া দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন নাগরিকের অধিকার তার রাজনৈতিক পরিচয়ে নির্ধারিত হবে না।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া এবং আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করতে। জামায়াতের এই ইশতেহার কেবল একটি কাগুজে দলিল নয়, বরং শহীদদের রক্তের ঋন শোধ করার একটি অঙ্গীকারনামা।
তারুণ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর স্বপ্ন
ইশতেহারে তরুণদের কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে আইটি খাতকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে রূপান্তর করবে। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের আহতদের পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টিও দলটির অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
শুক্রবার বিএনপি তাদের ইশতেহার ঘোষণা করার কথা রয়েছে। তার আগেই জামায়াতের এই ‘জনতার ইশতেহার’ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আবরার ফাহাদ ও আবু সাঈদের মতো সর্বজনীন আবেগকে ইশতেহারে ধারণ করার কৌশলটি নির্বাচনে কতটা ভোট টানতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে জামায়াত যে একটি আধুনিক ও সংস্কারপন্থী ইমেজ গড়ে তুলতে চায়, এই ইশতেহার তারই এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

