আধিপত্য আর গোষ্ঠীগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে আবারও উত্তপ্ত নরসিংদীর রায়পুরা। চরাঞ্চলের পুরোনো সেই প্রতিহিংসার আগুনে এবার বলি হতে হলো মুস্তাকিম মিয়া (১৪) নামের এক কিশোরকে। বুধবার সকালে উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়দাবাদ এলাকায় দুই পক্ষের গোলাগুলিতে প্রাণ হারায় এই স্কুলছাত্র। এই ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের।
নিহত মুস্তাকিম স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং সৌদি প্রবাসী মাসুদ রানার ছেলে। রাজনীতির মারপ্যাঁচ বা ক্ষমতার লড়াই সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না তার। বুধবার সকালে কেবল বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি বুলেট এসে বিদ্ধ করে তার শরীর। ঘটনাস্থলেই থেমে যায় এক কিশোরের প্রাণস্পন্দন।
আধিপত্যের আদিম লড়াই ও সায়দাবাদের ট্র্যাজেডি
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, সায়দাবাদ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই হানিফ মাস্টার ও এরশাদ মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এর আগে এই গোষ্ঠীগত সংঘাতে নারীসহ অন্তত আটজন প্রাণ হারিয়েছেন। বুধবার ভোরের আলো ফুটতেই এরশাদ মিয়ার অনুসারীরা দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালায়। মুহূর্তেই এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে এরশাদ গ্রুপের সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ মিয়ার ভাতিজা মাসুম ওরফে ‘চায়না’ এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। একটি গুলি সরাসরি মুস্তাকিমের শরীরের বাম পাশে বিদ্ধ হয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় সায়দাবাদ এলাকার রফিকুল ইসলাম, সোহান ও রোজিনা বেগমসহ আরও কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
‘আমার বুক যারা খালি করেছে, বিচার চাই’
নিহত মুস্তাকিমের মা শাহানা বেগমের আহাজারিতে সায়দাবাদের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার ছেলে কোনো দলাদলিতে ছিল না। ও কেবল বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ছিল। ফিরোজ মিয়ার ভাতিজা মাসুম সরাসরি আমার ছেলেকে টার্গেট করে গুলি চালাল। যারা আমার নিরপরাধ সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।”
রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বিমল চন্দ্র ধর জানান, মুস্তাকিমকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তার শরীরে প্রাণের কোনো চিহ্ন ছিল না। শরীরের এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ও প্রশাসনের অবস্থান
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই তারা সেনাবাহিনী ও বিজিবিসহ এলাকায় পৌঁছেছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গ্রামজুড়ে এক ধরণের থমথমে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে অনেক বাড়িঘর।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সাথে জড়িত মাসুমসহ অন্যদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। অপরাধীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে যৌথ বাহিনী। রায়পুরার দুর্গম চরাঞ্চলে অস্ত্র ও মাদক নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল, যাতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।

