আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও আস্থার বার্তা দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। মঙ্গলবার গাজীপুরে তিন বাহিনীর প্রধানদের এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ সক্ষম।
গাজীপুর আর্মি ক্যাম্পে আয়োজিত এই সভায় সেনাপ্রধানের পাশাপাশি নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী প্রধানও উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের ঠিক নয় দিন আগে উচ্চপর্যায়ের এই সমন্বয় সভাটি ভোটারদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতির বিষয়ে এক শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, এবারের নির্বাচনে অতীতে যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সারাদেশে ১ লাখেরও বেশি সেনা সদস্যের পাশাপাশি বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন এবং নৌবাহিনীর ৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও পুলিশ, আনসার, র্যাব ও বিজিবিসহ প্রায় ৮ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে।
সেনাপ্রধান বলেন, “নির্বাচন পরিচালনা ও নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি)। আমরা তাদের সহায়তায় ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর অধীনে মোতায়েন হয়েছি। আমাদের উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রশাসন ও ভোটারদের আশ্বস্ত করা যে, একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে যা যা প্রয়োজন, সশস্ত্র বাহিনী তার সবটুকুই করবে।”
এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন সেনাপ্রধান। তিনি জানান, পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। ড্রোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর নিজস্ব ড্রোনের পাশাপাশি পুলিশের ড্রোনও থাকবে। আমরা এই প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করব, যাতে আকাশ থেকেও প্রতিটি মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করা যায়।”
নিরাপত্তার নতুন সংযোজন হিসেবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ‘সুরক্ষা অ্যাপ’-এর কথা উল্লেখ করেন তিনি। এর মাধ্যমে পোলিং স্টেশনে বা ভোটকেন্দ্রে কী ঘটছে, তা সরাসরি দেখার ব্যবস্থা থাকবে। ডিজিটাল নজরদারির এই পদ্ধতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনী কারচুপি রোধে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ অর্থের লেনদেনের বিষয়েও কড়া সতর্কবার্তা দেন সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, “বিকাশ বা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার খবর আমাদের কানে এসেছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের সাথে কথা বলেছি যাতে এই ট্রানজেকশনগুলো নজরদারিতে আনা হয় এবং প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট সীমা (লিমিট) নির্ধারণ করা হয়।”
গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের তথ্য প্রাপ্তির বিষয়েও তিনি ইতিবাচক মনোভাব দেখান। সংবাদকর্মীদের সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, “মিডিয়ার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত চিত্র পৌঁছাবে। তাই তাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব।”
সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুঙ্গে। গাজীপুরের এই সভা থেকে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “ভোটারদের আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। আমরা ‘রোবাস্ট পেট্রোলিং’ বা শক্তিশালী টহলের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখব। ইনশাআল্লাহ, আমরা একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।”
তিন বাহিনী প্রধানের এই যৌথ উপস্থিতি এবং কড়া বার্তা নির্বাচনী মাঠে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ভোটারদের মনে আস্থা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

