রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর। যেখানে সিসি ক্যামেরা, কঠোর নিরাপত্তা প্রহরী আর স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সিস্টেমের নজরদারি থাকে চব্বিশ ঘণ্টা। কিন্তু সেই সুরক্ষিত বন্দরের ভেতর থেকেই কোটি কোটি টাকা মূল্যের ফেব্রিক্সভর্তি কনটেইনার ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য আমদানিকারক বুঝে নিতে গিয়ে দেখছেন— যে কনটেইনারের জন্য তিনি ১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন, তার কোনো অস্তিত্বই নেই বন্দরে।
এই নজিরবিহীন ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে চিঠি চালাচালি আর দোষারোপের পালা। কাস্টমস বলছে, পণ্যের হেফাজতকারী হিসেবে দায় বন্দরের; অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
ঘটনার নেপথ্যে: ১ কোটি ৬ লাখ টাকার ‘অদৃশ্য’ ফেব্রিক্স
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ই-অকশনের মাধ্যমে ২৫ হাজার ৬২৬ কেজি ইনডিগো রঙের ফেব্রিক্সভর্তি একটি কনটেইনার বিক্রি করে চট্টগ্রাম কাস্টমস। মেসার্স রিফাত এন্টারপ্রাইজ নামক একটি প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় পণ্যটি কিনে নেয়। ভ্যাট, ট্যাক্স ও বিড মূল্য পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানটিকে পণ্য খালাসের জন্য ‘ডেলিভারি অর্ডার’ (ডিবি) দেওয়া হয়। কিন্তু গত ২০ জানুয়ারি কাস্টমসের এক চিঠিতে জানানো হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ ওই কনটেইনারটি আমদানিকারককে বুঝিয়ে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। কারণ, কনটেইনারটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
একের পর এক উধাওয়ের ঘটনা: বিচ্ছিন্ন না পরিকল্পিত?
এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের আগস্টেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের আরও দুটি কাপড়ভর্তি কনটেইনার উধাও হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করে বন্দর ইয়ার্ডে গিয়ে দেখে— সেখানে কনটেইনার নেই। অথচ নিলামের আগে তারা স্বচক্ষে পণ্য পরিদর্শন করেছিলেন। সুরক্ষিত এলাকা থেকে ২৭ টন ওজনের বিশাল কনটেইনার এভাবে ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে যাওয়া কেবল সাধারণ চুরি নয়, বরং পরিকল্পিত ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’র ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন কী বলে আর দায় কার?
কাস্টমস আইন-২০২৩ অনুযায়ী, বন্দরে আসা বা বাজেয়াপ্ত হওয়া যে কোনো পণ্যের হেফাজতকারী (Custodian) হলো বন্দর কর্তৃপক্ষ। আইনের ধারা-১৩০ অনুযায়ী, সরকারি ওয়্যারহাউজে রক্ষিত পণ্যের যথাযথ সরবরাহ ও নিরাপদ হেফাজতের দায়িত্ব বন্দরের।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ জানান, “বিডার সব টাকা পরিশোধ করেছেন। আমরা বন্দর কর্তৃপক্ষকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। এখন তারা যদি কনটেইনার না পায়, তবে বিডারের অর্থ ফেরতসহ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়ভার তাদেরই।”
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “একটি যৌথ তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কনটেইনারটি কি অন্য কোনো ডিপোতে ভুল করে চলে গেছে, নাকি অন্য কোনো গাফিলতি আছে— তা তদন্ত শেষে জানা যাবে। দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি
নিলামের পণ্য না পেয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের। শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোটি টাকার মূলধন সাত মাস ধরে আটকে আছে। আমরা কি পণ্য কিনতে গিয়ে চুরির খপ্পরে পড়লাম?”
ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ২৮ আগস্ট বন্দরে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই ধরনের ঘটনা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও ভাবমূর্তিকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা পণ্য যদি খোদ রাষ্ট্রই বিডারকে বুঝিয়ে দিতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে এই নিলাম প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের আস্থার সংকট তৈরি হবে।

