আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভোটের মাঠে কালো টাকার প্রভাব কমাতে এবং ভোটারদের অবৈধভাবে প্রভাবিত করা ঠেকাতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে কঠোর সীমাবদ্ধতা আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো সেবাগুলোতে একজন গ্রাহক অন্যজনকে একবারে এক হাজার টাকার বেশি পাঠাতে পারবেন না।
রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই বিশেষ লেনদেন সীমা কার্যকর থাকতে পারে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চাহিদার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এই সুপারিশ করেছে। বর্তমানে একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারলেও, নির্বাচনের এই ছয় দিন দৈনিক মোট লেনদেনের সীমা নেমে আসবে মাত্র ১০ হাজার টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, “নির্বাচনের সময় অর্থের অপব্যবহার রোধে কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। লেনদেনের নতুন সীমা ও অন্যান্য বিধিনিষেধ নিয়ে চলতি সপ্তাহেই একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।”
শুধু মোবাইল ব্যাংকিং নয়, নিয়ন্ত্রণের জাল বিস্তৃত হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ওপরও। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্বাচনের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাপ (যেমন—আস্থা, সিটিটাচ, সেলফিন, নেক্সাস পে) ব্যবহার করে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (P2P) টাকা স্থানান্তর সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ রাখা হতে পারে। বর্তমানে এসব অ্যাপ দিয়ে দৈনিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যায়, যা নির্বাচনের সময় বড় অংকের অবৈধ লেনদেনের পথ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইসি।
তবে এই বিধিনিষেধ সাধারণ কেনাকাটা বা জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্চেন্ট পেমেন্ট বা ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো বিষয়গুলো এই সীমার বাইরে থাকতে পারে। তবে প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় এবং সমর্থকদের বৈধ অনুদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মে কোনো বাধা থাকবে না।
অন্যদিকে, নগদ টাকা উত্তোলন ও জমার ওপর গত ১১ জানুয়ারি থেকেই কড়া নজরদারি শুরু করেছে বিএফআইইউ। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক হিসাবে একদিনে ১০ লাখ টাকার বেশি নগদ লেনদেন হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। ব্যাংকগুলো যদি এই তথ্য দিতে গড়িমসি করে বা ভুল তথ্য দেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সব তফসিলি ব্যাংক বন্ধ থাকবে। এর সাথে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা চার দিন ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকছে। এই দীর্ঘ ছুটির সময় যাতে ডিজিটাল মাধ্যমে বড় কোনো অংকের অর্থ হাতবদল হতে না পারে, মূলত সেই লক্ষ্যেই ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ভোটের শুদ্ধতা বজায় রাখতে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানকে অনেকেই সাধুবাদ জানালেও, জরুরি প্রয়োজনে লেনদেনে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে কি না—তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য বলছে, পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে লেনদেনের এই সীমা প্রয়োজনে সমন্বয় করা হতে পারে।

