সাত দিন ধরে চুলা জ্বলছে না। ঘরে খাবার নেই, ছোট সন্তানদের মুখে তুলে দেওয়ার মতো একমুঠো অন্ন সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ এক সপ্তাহের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আজ আছড়ে পড়ল রাজপথে। রাজধানীর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত রায়েরবাগ ও শনিরআখড়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শত শত স্থানীয় বাসিন্দা।
রোববার ভরদুপুরে যখন তপ্ত রোদে জনজীবন অতিষ্ঠ, ঠিক তখনই কয়েকশ নারী-পুরুষ লাঠিসোটা ও খালি কলস নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। দুপুর পৌনে ১টার দিকে শুরু হওয়া এই আকস্মিক অবরোধে মুহূর্তের মধ্যেই দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত এই মহাসড়কটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সড়কের দুই পাশে সৃষ্টি হয় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট।
বিক্ষোভকারীদের চোখে-মুখে ছিল ক্লান্তি আর চরম অসন্তোষের ছাপ। অবরোধে অংশ নেওয়া গৃহিণীরা জানান, গত সাত দিন ধরে তাদের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ। মাঝেমধ্যে গভীর রাতে সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে পানি গরম করাও সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে বারবার ধরনা দিয়েও কোনো সুরাহা না মেলায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক উত্তেজিত বাসিন্দা বলেন, “আমরা কি মানুষ নই? সাত দিন ধরে গ্যাস নেই, কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা শুধু আশ্বাস দেয়। পেটে খিদে নিয়ে কতক্ষণ সহ্য করা যায়? তিতাস গ্যাস অফিস থেকে সুনির্দিষ্ট সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত আমরা রাস্তা ছাড়ব না।” তাদের এই অনড় অবস্থান পুরো এলাকার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা বিকল্প হিসেবে কেরোসিন চুলা বা ইলেকট্রিক হিটার ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। তবে হুট করে এই বাড়তি খরচের বোঝা বহন করা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের অভিযোগ, বাজারে এখন বিকল্প জ্বালানির দামও চড়া, যা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবরোধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যাতায়াত ব্যবস্থায়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেটমুখী সব ধরনের যানবাহন আটকা পড়েছে। শত শত বাস, ট্রাক এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সড়কের ওপর। বিশেষ করে অফিসগামী যাত্রী, মুমূর্ষু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স এবং পণ্যবাহী ট্রাকগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। অনেক যাত্রীকে বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হতে দেখা গেছে।
চট্টগ্রামগামী একটি বাসের যাত্রী স্কুল শিক্ষক রহিমউল্লাহ জানান, তাকে জরুরি কাজে কুমিল্লা যেতে হচ্ছে। কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তিনি রায়েরবাগ মোড়ে আটকে আছেন। তিনি বলেন, “গ্যাস সংকটের ভোগান্তি সাধারণ মানুষের, আবার অবরোধের কারণে ভোগান্তিও আমাদেরই। কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আগেই এর সমাধান করা।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। ডেমরা জোনের ট্রাফিক ও থানা পুলিশের একাধিক টিম বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। তবে আন্দোলনকারীরা কোনো মৌখিক আশ্বাসে কর্ণপাত করছেন না। তাদের দাবি, গ্যাস না আসা পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
ডেমরা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সাজেদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, গ্যাস সংকটের বিষয়টি মানবিক হলেও মহাসড়ক অবরোধ করায় হাজার হাজার মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করছি। তাদের দাবিগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই যান চলাচল স্বাভাবিক হবে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের ওপর টায়ার জ্বালিয়ে এবং মানবপ্রাচীর তৈরি করে বিক্ষোভ করছেন এলাকাবাসী। পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হলেও বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। তবে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার আশঙ্কা থেকে এলাকাজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের মৌসুমে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া একটি নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সাত দিন ধরে পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ থাকাটা ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ত্রুটি নির্দেশ করে। পাইপলাইনের সংস্কার কাজ নাকি সরবরাহের ঘাটতি—সে বিষয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিকেল গড়ানোর সাথে সাথে যানজটের দৈর্ঘ্য আরও বাড়ছে। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ, অন্যদিকে আটকা পড়া যাত্রীদের হাহাকার—সব মিলিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রায়েরবাগ অংশ এখন এক অস্থির জনপদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও গ্যাস কর্তৃপক্ষের দ্রুত সমন্বয় না হলে এই অসন্তোষ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

