শীতের বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ের মলানী বাজারের জনসভায় যখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাইক ধরলেন, তখন তার কণ্ঠে রাজনৈতিক হুঙ্কারের চেয়েও বেশি ছিল এক ধরণের আর্তি আর অভিজ্ঞতার ভার। বিএনপির মহাসচিব স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, বয়সের ভার আর শারীরিক অসুস্থতার কারণে এটিই হতে যাচ্ছে তার জীবনের শেষ নির্বাচন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি এবার নিজ এলাকার মানুষের কাছে এক শেষ সুযোগ চেয়েছেন।
বুধবার বিকেলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই নির্বাচনি পথসভায় ফখরুল মূলত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরেই আগামীর স্বপ্নের জাল বোনেন। তিনি বলেন, “আমাদের নেতা তারেক রহমানের মধ্যে মানুষ আজ নতুন আশার আলো দেখছে। গতকাল ময়মনসিংহের সমাবেশে যে জনস্রোত আমরা দেখেছি, তা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ কেন আসছে? কারণ তারা এমন একজন নেতাকে খুঁজে পেয়েছে, যে তাদের সুদিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।”
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরতে গিয়ে ফখরুল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের কথা বলেন। তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তন করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনা, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুবিধা পাওয়া যাবে। কৃষকদের জন্যও আলাদা কার্ডের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে তারা সার ও বীজ ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ করতে পারেন।
নিজের ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই ঝানু রাজনীতিক। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, “৯১ সাল থেকে আপনাদের সাথে আছি। রাজনীতি করে কি সম্পদ বানিয়েছি? উল্টো বাবার সম্পত্তি বিক্রি করেছি। ঠাকুরগাঁও শহরের নিজের বসতবাড়ির অর্ধেকটাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে রাজনীতির পেছনে। আপনাদের কাজ করে দিয়ে কখনো এক কাপ চাও কি চেয়েছি?”
গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছিল। মিথ্যা মামলা আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে নেতা-কর্মীদের ধানখেতে রাত কাটাতে হয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসার হত্যার মতো গায়েবি মামলার বোঝা বইতে হয়েছে। তবে এখন মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভয়ের পরিবেশ কাটতে শুরু করেছে, মানুষ এখন নিজের ভোট নিজে দেওয়ার সুযোগ চায়।”
নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে খোঁচা দিতেও ছাড়েননি তিনি। আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের অনুপস্থিতি এবং অন্য ছোট দলগুলোর সক্রিয়তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ভোটারদের মনে করিয়ে দেন যে, দুর্দিনের সাথী হিসেবে তিনিই সবসময় পাশে ছিলেন। বয়সের কারণে আগামী পাঁচ বছর পর আর ভোটে দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকবে না জানিয়ে ফখরুল বলেন, “এবার আপনাদের সমর্থন আমার খুব প্রয়োজন। আপনাদের জন্য কাজ করার একটা শেষ সুযোগ চাই।”
ঠাকুরগাঁওয়ের রায়পুর ইউনিয়নের এই পথসভাটি এক পর্যায়ে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল দীর্ঘদিনের পরিচিত এক অভিভাবকের বিদায়ী সংবর্ধনার মতো আবহে। যেখানে দাবি-দাওয়ার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল দীর্ঘ সম্পর্কের টান।

