দীর্ঘ এক দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে বিচার পেলেন গোপালগঞ্জ জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান বাসুর পরিবার। ২০১৬ সালে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার দুপুরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. রহিবুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের এই রায় ঘোষণার সময় এজলাস কক্ষে এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। রায়ে পাঁচজনের ফাঁসির আদেশের পাশাপাশি চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল প্রসিকিউটর আব্দুর রশীদ মোল্লা সাংবাদিকদের এই দণ্ডাদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই রায়কে ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— বুলবুল শেখ, হেদায়েত শেখ, তফসির শেখ, কিবরিয়া আল কাজী এবং ঝন্টু শেখ। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই আসামিরা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের অপরাধের মাত্রা ছিল ক্ষমার অযোগ্য। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিচারক এই কঠোর সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
ঘটনার সূত্রপাত ১০ বছর আগে। ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতটি ছিল গোপালগঞ্জের পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জন্য এক বিভীষিকাময় সময়। সেদিন কুয়াডাঙ্গা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন অফিস থেকে কাজ সেরে মৌলভীপাড়ার নিজ বাসায় ফিরছিলেন শ্রমিক নেতা সাইদুর রহমান বাসু। পথিমধ্যে একদল সশস্ত্র হামলাকারী তার ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাসুকে কেবল কুপিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নির্মমভাবে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন হাড় গুঁড়িয়ে দিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, পরদিন সকালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোপালগঞ্জ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ আর প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। ঘটনার দুই দিন পর, ১৯ ফেব্রুয়ারি বাসুর ছোট ভাই জাসু শেখ বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি শুরু থেকেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল, কারণ এটি ছিল একজন জনপ্রিয় শ্রমিক নেতার হত্যাকাণ্ড।
মামলা দায়েরের পর পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। ২০১৬ সালের ১২ জুলাই গোপালগঞ্জ সদর থানার উপ-পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হযরত আলী ২৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, পেশাগত বিরোধ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই বাসুকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষা হয়েছিল।
২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে মামলার গুরুত্ব এবং দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট এটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ শুনানি, জেরা এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের পর আজ এই চূড়ান্ত রায় এল।
আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নিহতের স্বজনরা এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বাসুর ভাই জাসু শেখ ভাঙা গলায় সাংবাদিকদের বলেন, দশটি বছর আমরা এই দিনের অপেক্ষায় কাটিয়েছি। আমার ভাইকে যারা এভাবে কসাইয়ের মতো কুপিয়ে মারল, তাদের ফাঁসির আদেশ হওয়ায় আমাদের মনে আজ কিছুটা শান্তি এল। আমরা চাই দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হোক।
অন্যদিকে, আসামীপক্ষের আইনজীবীরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, বিচারে কিছু তথ্যগত ত্রুটি থেকে গেছে এবং উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তবে প্রসিকিউশন পক্ষ মনে করছে, পেশ করা সাক্ষ্যপ্রমাণ এতটাই অকাট্য ছিল যে উচ্চ আদালতেও এই দণ্ড বহাল থাকবে।
শ্রমিক নেতা বাসু হত্যার এই বিচার কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল গোপালগঞ্জের পরিবহন সেক্টরে বিদ্যমান অস্থিরতা আর পেশীশক্তির বিরুদ্ধে আইনের শাসনের জয়। পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে বাসু ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, যার কারণে তার মৃত্যুতে ওই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছিল। আজকের এই রায় সমাজে এই বার্তাই পৌঁছে দিল যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আসা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই রায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। দীর্ঘ এক দশকের ক্লান্তি শেষে বাসুর পরিবার এখন শেষ বিচারের আশায় বুক বাঁধছে, যা অপরাধীদের দণ্ড কার্যকরের মাধ্যমেই পূর্ণতা পাবে।
আদালতের এই দীর্ঘ রায়ে পলাতক ও উপস্থিত আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদানের মাধ্যমে একটি সুদীর্ঘ আইনি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালতের আইনি প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্তভাবে কবে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আজ বিকালেই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কড়া নিরাপত্তায় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

